কুড়িগ্রামে একই পরিবারের ৬ জনই মানসিক রোগী
মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামী-সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই দোলেনার
পিএম সৈকত, কুড়িগ্রাম : একটি টিনের চালা। সেই চালায় স্বামী-স্ত্রীসহ ৬জন মানুষ। অথচ পরিবারের একজনও পুরোপুরি সুস্থ নন। কারও জন্ম থেকেই মানসিক সমস্যা, কারও বয়স বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে একই ধরনের অসুস্থতা। অভাব, অনাহার আর চিকিৎসাবঞ্চনার সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ে এভাবেই দিন কাটছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামের একটি পরিবারের। চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও নিয়মিত সহায়তার অভাবে পরিবারটির জীবন যেন আটকে আছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়। একদিকে মানসিক অসুস্থতা, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য-দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দোলেনা বেগমের একটাই চেষ্টা। যেভাবেই হোক পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিয়ে হাসি ফুটানো।
পরিবারটির প্রধান রঞ্জন মিয়া (৬৫)। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘রঞ্জন পাগলা’ নামে পরিচিত। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, জন্ম থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন। তার স্ত্রী দোলেনা বেগম (৫৫) নিজেও আংশিক মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তাদের চার সন্তান-রনজি খাতুন (৩০), দেলোয়ার (২৩), অধিফা খাতুন (২০) ও দানিয়েল (১৭) সবার মধ্যেই একই ধরনের মানসিক সমস্যার লক্ষণ রয়েছে।
ফলে ৬ সদস্যের এ পরিবারে উপার্জনক্ষম ও সুস্থ কোনো সদস্য নেই। নেই নিজস্ব জমিজমা কিংবা স্থায়ী আয়ের উৎসও। অন্যের জমিতে তৈরি একটি জরাজীর্ণ টিনের চালায় কোনোমতে মাথা গুঁজে বসবাস করছেন তারা।
ঘরের ভেতর যেন প্রতিদিনই অস্থিরতার এক চিত্র। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, গালিগালাজ আর নানা ধরনের আচরণে কেটে যায় দিনের বড় একটি সময়। অসুস্থতার কারণে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই পরিবারের একমাত্র ভরসা দোলেনা বেগম। নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। দিন শেষে সামান্য মজুরি পান। তা দিয়েই কোনো রকমে খাবার জোটে পরিবারের সদস্যদের। এর পাশাপাশি তিন মাস পরপর পাওয়া প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থও তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।
কথা বলতে গিয়ে দোলেনা বেগমের কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের কষ্ট। তিনি বলেন, গরিব ঘরের মাইয়া মুই। পাগলা মানুষের সঙ্গে মোক বিয়ে দিছে। মোর স্বামী কোনো কাজ করতে পারে না। মুই খুব কষ্ট করি চারটা ছাওয়া বড় করছং। ওরা সবাই অসুস্থ। ঠিকমতো খাইতে পাই না, খুব কষ্টে আছং।
প্রতিবেশী শামসুন্নাহার বেগম বলেন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে-পরিবারের সবাই অসুস্থ। দোলেনা মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালান। সরকারিভাবে আরও সহায়তা পেলে পরিবারটি একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারত।
আরেক প্রতিবেশী কামরুজ্জামান বলেন, পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। ঘর নেই। অন্যের জমিতে বসবাস করতে হচ্ছে। পরিবারের সবাই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে তাদের জীবন কিছুটা সহজ হতে পারে।
এবিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন জানান, ওই পরিবারের সব সদস্যই সরকারি ভাতার আওতায় রয়েছেন। সরকারিভাবে নতুন কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে তাদের তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, পরিবারটির বিষয়ে আগে তার জানা ছিল না। তারা হাসপাতালে এলে চিকিৎসার বিষয়ে সহায়তা করা সম্ভব হবে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারের কয়েকজনের অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও নিয়মিত সহায়তার অভাবে পরিবারটির জীবন যেন আটকে আছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়। একদিকে মানসিক অসুস্থতা, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য-দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দোলেনা বেগমের একটাই চেষ্টা, যেভাবেই হোক পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়া।
(পিএস/এসপি/অক্টোবর ১৫, ২০২৬)
