রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : মোবাইল ফোনে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে চুরির নাটক সাজিয়ে দফায় দফায় নির্যাতনের পর শ্মশানের আম গাছে বেঁধে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে হাত, পা, বুকের পাজড় ভেঙে দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা নলতা গ্রামের জেলেপাড়ার মনিন্দ্র নাথ মণ্ডলের ছেলে ঘের মালিক ক্ষিতিশ মণ্ডলকে। 

অভিযোগ, হত্যার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করেনি।
সরেজমিনে শনিবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে তালা উপজেলার জেয়ালা জেলেপাড়ায় যেয়ে দেখা গেছে, একমাত্র ছেলে উৎপল মণ্ডল পিতৃদশা কাটাতে বাড়িতে থান কাপড় পরে বসে আছেন। পাশে বসা তার মা সুলেখা মণ্ডল, কাকা সুকুমার মণ্ডল, আশুতোষ মণ্ডল ও পরিতোষ মণ্ডলসহ প্রতিবেশীরা। শুক্রবার ভোর তিনটার কিছুক্ষণ আগে ঘের মালিক হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে কিভাবে ক্ষিতিশ মণ্ডলকে চোর আখ্যা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে তার বর্ণণা দেন তারা। ঘটনার অন্যতম নায়ক স্বদেশ ঘোষ ও ক্ষিতিশ ঘোষের নাম থানার মধ্যে এজাহার লেখার সময় নাম বাদ দেওয়ায় ও আসামী গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

এ প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে উৎপল মণ্ডল বলেন, তারা এক বোন ও এক ভাই। চার শতক জমির উপরে তাদের বসাবাস। বাবা ক্ষিতিশ মণ্ডল ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাড়ির পাশের মোবারক আলী খাঁ, লুৎফর খাঁ, রাজাউল্লাহ পাড় ও আলী খাঁসহ কয়েকজনের কাছ থেকে দুই বিঘা জমি লীজ নিয়ে মাছ ও মাছের ঘেরের ভেড়িতে সবজি চাষ করে আসছেন। দুই বিঘা জমির লীজ বছরে ৩০ হাজার টাকা। নিজে পল্লী বিদ্যুতের একজন ঠিকাদারের অধীনে চুয়াডাঙায় সাত মাস ধরে কাজ করেন। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না।

উৎপল মণ্ডল তার বাবার মৃত্যুকালিন জবানবন্দির বরাত দিয়ে আরো জানান, শুক্রবার ভোর তিনটার কিছুক্ষণ আগে তার বাবাকে পার্শ্ববর্তী ঘের মালিক খুলনার ডুমুরিয়া থানাধীন চণ্ডিপুর গ্রামের আব্বাস শেখের ছেলে শেখ হাবিবুর রহমান ডেকে তার উত্তর খোলার ঘেরের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পরিকল্পিতভাবে চোর আখ্যা দিয়ে মাথায় লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। পরে তাকে কানা বিশ্বনাথ ঘোষের ঘেয়ে ফেলে দিয়ে চোর চোর করে চিৎকার করা হয়। জীবন ভয়ে বাবা ঘেরের ভেড়ি দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে জগন্নাথ ঘোষের ছেলে বিশ্ব ঘোষসহ কয়েকজন বাবার হাত ও পা বাঁধার পর বাঁশের সাথে বেঁধে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে বাবা নিজেই তাদের ইচ্ছামত জায়গায় যেতে রাজী হয়।

এ সময় জগন্নাথ ঘোষের ছেলে বিশ্ব ঘোষের ঘের কর্মচারি ইব্রাহীম হোসেন, সমর ঘোষ ও গফফার শেখ বাবাকে ধরে জেয়ালা ঘোষপাড়া মহাশ্মশানের দিকে নিয়ে যাওয়ার একপর্যায়ে সেখানে চলে আসেন তাদের গ্রামের গোপাল ঘোষের ছেলে স্বদেশ ঘোষ ও নন্দলাল ঘোষের ছেলে ক্ষিতিশ ঘোষ। সেখানে মারপিটের একপর্যায়ে দুই হাত ও দুই পা শ্মশানের আম গাছের সাথে পিঠ মোড়া দিয়ে বেঁধে লোহার রড ও হাঁতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়। ভেঙে দেওয়া হয় দুই হাত ও দুই পা। তার জমি, ঘরবাড়ি ও গরু বাছুরসহ সব কিছুর বিনিময়ে নিজের জীবন ভিক্ষা চান বাবা। এরপরও তার বুকে এলোপাতাড়ি ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়ে বুকের পাজর ভেঙে দেওয়া হয়। এ সময় শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়া ফারুক শেখ, মাহাবুব পাড় ও সাজ্জাদ হোসেন বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বা পুলিশে দেওয়ার জন্য গফফার শেখ, ক্ষিতিশ ঘোষ ও স্বদেশ ঘোষকে বলে।

নির্যাতনকারির তাদেরকের হুমকি দেয়। ঘের কর্মচারি আরশনগরের রিপন ও শামীমের মাধ্যমে খবর পেয়ে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মা সুলেখা মণ্ডল বাবাকে উদ্ধার করে ভ্যানে তোলার জন্য কোন লোকের সহযোগিতা পাননি। একপর্যায়ে ১৫০ টাকা দিয়ে দুইজনের সহযোগিতায় বাবাকে স্থানীয় আবুল কাশেমের ভ্যানে তুলে সকাল আটটটার দিকে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখনে প্রাথমিক চিকিৎসা পরবর্তী সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুপুর ১২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগেই জরুরী বিভাগে বাবা মারা যান। রাত ৮টার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে রাতেই স্থানীয় শ্মশানে বাবার লাশ দাফন করা হয়। রাতেই থানায় যেয়ে মাকে দিয়ে এজাহার লেখানোর সময় ক্ষিতিশ ঘোষ ও স্বদেশ ঘোষের নাম বলা হলেও মামলা রেকর্ড করার পর কপি দেখে তিনি জানতে পারেন যে, কৌশলে দুটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে লেখার সময়। তিনি সম্পূক এজাহার হিসেবে ওই দুটি নাম এজাহারভুক্ত করার জন্য থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট দাবি জানান। মব সৃষ্টি করে দেবহাটার ওয়াহেদুজ্জামানকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের যেভাবে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সেইভাবে তার বাবার হত্যাকারিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান উৎপল মণ্ডল।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ক্ষিতিশ ঘোষ ও স্বদেশ ঘোষ জানান, তারা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তারা ওই সময় ঘটনাস্থলে যাননি। একটি মহল তাদেও নাম এ মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করছে।

তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ সিরাজুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ক্ষিতিশ মণ্ডলকে মূমৃর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রাক্কালেই দুপুর ১২টার দিকে তিনি মারা যান।

তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহসিন আলী আজ রবিবার দুপুরের দিকে এ প্রতিবেদকে জানান, তারা আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যহত রেখেছেন। খুব শীঘ্র ভাল কোন খবর দিতে পারবেন।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ১৮, ২০২৬)