রহিম আব্দুর রহিম, পঞ্চগড় : সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বীদের সার্বজনীন দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে প্রতিবছর ন্যায় এবারও পঞ্চগড়ের প্রত্যন্তপল্লী, পঞ্চগড় সদর উপজেলার ৪নং কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের গলেহাবাজার দুর্গাপূজা মন্ডবে মঞ্চস্থ হয়েছে শাস্ত্রীয় পালা 'দানবীর রাজা হরিশচন্দ্র।

'ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ থেকে আগত, কলিনপাল পরিচালিত দানবীর রাজা হরিশচন্দ্র পালায় মোট অভিনেতা মোট ১৩জন। ছেলেরাই মেয়ে সেজেছেন, পরিচালক পলিনপাল নিজেই কন্ঠ দিচ্ছেন, কখন মেয়েলী,আবার কখন পুরুষের কন্ঠে ভেসে আসা সংলাপের সাথে অভিনেতারা শুধু শারীরিক ভঙ্গি মিলিয়ে নিচ্ছে।

অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এই অভিনেতাদের নিঁখুত অভিনয়ে দর্শকশ্রোতারা মুগ্ধ। পালা শুরুতে নেই গতানুগতিক যাত্রা কিংবা ঝুমুর পালার মত বন্দনাগীতি। তবে কৃষ্ণ সাজে নৃত্যগীতে শুরু হওয়া পালার প্রারম্ভেই দর্শকদের আকৃষ্ট করে তোলে । পালার কাহিনী গুরুগম্ভীর শাস্ত্রীয়, দানবীর রাজা হরিশচন্দ্রের কাছে রাজ্যের যে যা কিছু কামনা করেন, তাকে তা দিয়ে সাহায্য করেন। একদিন রাজা শিকারে গিয়ে দেখতে পারেন, বনরাজ্যের অসুর দেবতা স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরীরদলকে আটক করে রেখেছে।দানবীর রাজা হরিশ চন্দ্রের কাছে পরীরদল মুক্তি কামনা করলে রাজা তাদের মুক্ত করে দেন।দানবীর রাজার কাছে একদিন এক সাহায্য প্রার্থী তার সিংহাসন চেয়ে বসেন। রাজা তাকে সিংহাসনই দিয়ে দেন। এবার রাজাই পথের ফকির সাজেন। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে বন থেকে মুক্তি পাওয়া স্বর্গপরীরা রাজার দুর্দিনে এগিয়ে আসলে আবার রাজা তাঁর সিংহাসন ফিরে পান।

জ্ঞান, শিক্ষা, প্রকৃতি ও প্রাণের প্রতি দরদ ও ভালোবাসার কাহিনী নিয়ে নির্মিত পালা সারারাত জেগে, হাজার হাজার নারী পুরুষ, শিশু-কিশোররা পালা উপভোগ করেন।

নস্করপাড়া গ্রামের ৫০ বছর বয়স্ক তহিদুল মাটিতে বসেই সারারাত ধরে পালা উপভোগ করেছেন। তিনি তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, এই সমস্ত গান বাজনা মানুষকে যে শিক্ষা দেয়,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেও তা অর্জন সম্ভব নয় ।

৮০ উর্ধ্বো গোমতি রাণীর শ্বশুর বাড়ি ঘটবর, তিনি এসেছেন বাপের বাড়ি ফুলপাড়ায় পূজা অর্চনা শেষে গান শোনায় তার উদ্দেশ্য।সে মাটিতে বিছানো ত্রিফলে বসে পালা উপভোগ করছেন।পালাটা তার কাছে ভালো লেগেছে,কখন নাচ, কখনও গান,আবার কখনও পশুর শব্দে তিনি বিমোহিত।

গলেহাহাট ফাযিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির সানজিদ ইসলাম সজিব এসেছে পালা দেখতে।মানুষের ভীড়ে দেখতে না পেরে,সে এবং তার বন্ধুরা দলবেঁধে তিনচাক্কার খোলা ভ্যানে উঠে পালা উপভোগ করছে। দানবীর রাজার কাহিনী তাকে মুগ্ধ করেছে।আজ মহা অষ্টমীর দিনের পালাও সে দেখবে।

গলেহাবাজার মন্দির কমিটির সভাপতি ও আয়োজক কমিটি প্রধান বিদ্যারায় জানায়, এলাকার হিন্দু মুসলিমদের সম্মিলিত আকাঙ্খা পুরনে প্রতিবছর পূজায় এই সমস্ত পালাগানের আয়োজন করি থাকি।এবছর দলটি সপ্তমীরাতে এবং অষ্টমীর সকালে কৃষ্ণপালা মঞ্চস্থ করবে। দলটিকে মোট ২২০০০/হাজার টাকা সম্মানী দিতে হচ্ছে।এই টাকার বেশী অংশই স্থানীয় হিন্দু-মুসলিমদের দেওয়া অনুদানে পরিশোধ করা হচ্ছে।

পালাকার ও পরিচালক কলিনপাল বলেন, পূজার সময় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিবাহ, সন্তান ভূমিষ্টকালে আমরা আমন্ত্রণ পেয়ে থাকি। খেটে খাওয়া মানুষরা এতে অভিনয় করে।সরকারের কোন অনুদান আমরা পাই না। তাঁর দাবি লোকজ এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দরকার।

(এআর/এএস/অক্টোবর ১৯, ২০২৬)