সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত
স্টাফ রিপোর্টার : ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৩৭ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। এছাড়া পথচারী হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন (৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ) মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু (২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ)। এছাড়া রাস্তা পারাপার বা সড়কে হাঁটার সময় যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু, যা মোট নিহতের ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।
পথচারী হিসেবে নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে তিন চাকার যানবাহনের ধাক্কায়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নছিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ২৭১ শিশু। পথচারী হিসেবে নিহত শিশুদের মধ্যে এ সংখ্যা ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
এছাড়া বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ১২৬ শিশু (৪০ দশমিক ৪ শতাংশ)। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ৩১৭ শিশু (১১ দশমিক ২৭ শতাংশ)। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৯৮ শিশু (৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ)।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শিশু নিহত হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এ ধরনের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট নিহতের ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮২ শিশু (২৬ দশমিক ১৪ শতাংশ), মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ শিশু (২৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ) এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু (১৫ শতাংশ)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৫১৩ শিশু, যা মোট নিহতের ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু (১২ দশমিক ৮ শতাংশ)।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কগুলো সাধারণত বসতবাড়ির কাছ দিয়ে গেছে। এসব সড়কে যানবাহন চলাচলে নিয়ম-শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিও সীমিত। অন্যদিকে, শিশুদের নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে এসব সড়কে শিশুদের হতাহতের ঝুঁকি বাড়ছে।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেলে সবচেয়ে বেশি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৬৩৪ শিশু, যা মোট নিহতের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু (২৭ দশমিক ২২ শতাংশ) এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু (২২ দশমিক ৭৬ শতাংশ)। এছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু নিহত হয়েছে।
বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ জন প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট নিহতের ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু (৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ) এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু (১৯ দশমিক ২৩ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর জন্য সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসা সংকটকে দায়ী করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। চিকিৎসার ব্যয় বহনে অনেক পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতাকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষায় সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা সুবিধা ও সক্ষমতা বাড়ানো, আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক অব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে শিশুরা নিহত হওয়ার পাশাপাশি পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
(ওএস/এএস/অক্টোবর ২১, ২০২৬)
