রিপন মারমা, রাঙামাটি : বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ বা প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে বইছে আনন্দের হাওয়া। মারমা ভাষায় ‘ওয়াগ্যোয়াই’ অর্থ প্রবারণা পূর্ণিমা এবং ‘পোয়ে’ অর্থ উৎসব। উৎসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বাড়ছে সাজসাজ রব। উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ময়ূর আকৃতি রথ যাত্রা  ও আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানোকে কেন্দ্র করে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় তরুণরা।

কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন গ্রাম ও পল্লীতে চলছে ফানুস বানানোর চমৎকার কর্মযজ্ঞ। বাঁশের সরু কাঠি, রঙিন কাগজ ও আঠার নিপুণ ব্যবহারে তৈরি করা হচ্ছে নানা রঙের আকর্ষণীয় ফানুস, যা প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে রাঙিয়ে তুলবে কাপ্তাইয়ের আকাশে।

পাশাপাশি ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজও চলছে জোরেশোরে। আগামী ২৫ অক্টোবর গ্রাম ও পল্লীর পাশাপাশি বৌদ্ধ বিহারগুলোতে তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে সারারাত ধরে ঐতিহ্যবাহী পিঠা বানানোর প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। তৈরি এসব পিঠা ভোরে বৌদ্ধ বিহারের ভান্তেদের (সংঘ) উদ্দেশে উৎসর্গ ও দান করা হবে। কাপ্তাইয়ের ঐতিহ্যবাহী চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এই উৎসবের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এখানে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘সত্য বুদ্ধ’ মূর্তি দেখতে উৎসবের দিনগুলোতে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। প্রবারণা পূর্ণিমার দিন প্রতিটি গ্রাম থেকে সর্বস্তরের মানুষ নেচে-গেয়ে, ঢাকঢোল বাজিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠবেন।

শোভাযাত্রা সহকারে ‘কল্পতরু’ বা টাকার গাছ নিয়ে বিহারে যাওয়া হবে। ভান্তেদের উদ্দেশ্যে পিন্ডদান, ছোয়াং (খাদ্যসামগ্রী) ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দানের পর সন্ধ্যার আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের আমেজ চরমে পৌঁছাবে। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে আগামী ২৭ অক্টোবর বর্ণাঢ্য রথযাত্রার মাধ্যমে। ওই দিন কাপ্তাই রাইখালী নারানগিরি বৌদ্ধ বিহার থেকে ময়ূরের আদলে তৈরি একটি দৃষ্টিনন্দন রথে গৌতম বুদ্ধের প্রতিমূর্তি বসিয়ে রথ টানা হবে। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে রথটি হাপছড়ি প্রদক্ষিণ করে মাঝিপাড়ায় এসে শেষ হবে। এরপর ঐতিহ্যবাহী ময়ূর রথটি কর্ণফুলী নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মারমা সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী ওয়াগ্যোয়াই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।

এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদে সদস্য উথোয়াই মং মারমা বলেন, “ওয়াগ্যোয়াই উৎসব আমাদের মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। এই উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হয়।”

স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য মিনুপ্রু মারমা বলেন, “উৎসবকে ঘিরে ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। এলাকার নারীরা পিঠা তৈরি ও ঘরবাড়ি সাজানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা সাচিংউ মারমা বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের জীবনে অনাবিল শান্তি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আমরা এবারও উৎসবটি উদযাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।”

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এই পূর্ণিমা উদযাপিত হয়। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, এই পূর্ণিমা পালনের মাধ্যমে ভিক্ষু ও গৃহীদের পাপমোচন হয়। এ বছরের প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—মঙ্গল শোভাযাত্রা ও ময়ূর আকৃতির বিশাল রথযাত্রা আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানো হাজার প্রদীপ প্রজ্বলন ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব ও ভোরে বুদ্ধকে পিঠা দান পঞ্চশীল গ্রহণ, বুদ্ধপূজা, সংঘদান ও পিন্ডদান।

(আরএম/এসপি/অক্টোবর ২২, ২০২৬)