স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবলে গোল, ট্রফি আর ব্যক্তিগত অর্জনের হিসাব দিয়ে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারকে বর্ণনা করা যায়। কিন্তু মাঠের বাইরেও তাঁর প্রভাব অনেক বিস্তৃত! এবার তারই স্বীকৃতি পেলেন এলএম১০। স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ডের ক্রীড়া বিভাগে সম্মানিত হয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। শুধু অসাধারণ ফুটবলীয় দক্ষতা নয়, দলগত চেতনা, বিনয় এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তাঁর দাতব্য কাজও এই স্বীকৃতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্পেনের ওভিয়েদোর ক্যাম্পোয়ামর থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মেসির হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রিন্সেস লিওনর। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া প্রথম ফুটবলার হয়েছেন ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক। এর আগে ২০১২ সালে যৌথভাবে এই সম্মান পেয়েছিলেন স্পেনের দুই কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজ ও ইকার ক্যাসিয়াস।

স্বীকৃতির কেন্দ্রে মেসির ফুটবলীয় দর্শন
মেসির ক্যারিয়ারের বিশেষত্ব কেবল গোল কিংবা শিরোপার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয়, ধারাবাহিকতা এবং ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতাও তাঁকে আলাদা করেছে। পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থার বিচারকমণ্ডলীও তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।

প্রিন্সেস লিওনর বলেন, “এমন আর কোনো বিষয় আছে কি না, যা সর্বজনীন অনুভূতি তৈরি করতে পারে। একটি মুহূর্ত, যে গোলের জন্য সবাই অপেক্ষা করে, যাতে সবকিছু মিলে যায়। এ কারণেই মেসির দিকে এবং তাঁর অতুলনীয় ক্যারিয়ারে তাকানোটা অর্থবহ। স্পোর্তিং গিহনের এক সাবেক খেলোয়াড়ের ভাষায়, ‘তিনি এক মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং অহংকারকে ছাপিয়ে দলগত চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।’ এটি আমাদের সামনে আর্জেন্টাইন ফুটবলারের এক দারুণ সংজ্ঞা তুলে ধরে।”

পুরস্কার পাওয়ার পর ইনস্টাগ্রাম পোস্টে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন মেসি। তিনি লেখেন, ‘ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা দারুণ সম্মানের। সব পুরস্কারজয়ীকে অভিনন্দন, আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে দারুণ সময় কেটেছে।’

মেসির ফুটবলীয় পরিচয়ের সঙ্গে স্পেন ও বার্সেলোনার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ক্লাবটির একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। এরপর বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক, বিশ্বসেরা হয়ে ওঠা এবং অসংখ্য শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর কিংবদন্তি ক্যারিয়ার।

কাতালান ক্লাবটির হয়ে ৬৭২ গোল ও ৩৫টি ট্রফি জিতেছেন মেসি। ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার পর দুই মৌসুম কাটান পিএসজিতে। এরপর যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। ৩৯ বছর বয়সেও ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।

মাঠের বাইরেও মেসির কাজ এই পুরস্কারের স্বীকৃতির একটি বড় কারণ। তাঁর ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে কাজ করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও শিশুদের কল্যাণে যুক্ত আছেন তিনি।

স্পেনের রাজপরিবারের সংবর্ধনায় মেসি
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে শুক্রবার দুপুরে ওভিয়েদোর হোটেল দে লা রেকনকিস্তায় অন্য পুরস্কারজয়ীদের সঙ্গে প্রিন্সেস লিওনরের সংবর্ধনায় অংশ নেন মেসি। স্পেনের রাজপরিবারের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

পুরস্কার নেওয়ার আগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওভিয়েদোর হোটেল দে লা রেকনকিস্তায় সস্ত্রীক মেসি, তাদের স্বাগত জানাচ্ছেন প্রিন্সেস লিওনর।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও। মেসির উত্তরাধিকার ও ফুটবলে তাঁর অবদান নিয়ে প্রশংসা করেন তিনি। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘খেলাধুলা ও ফুটবলে মেসি যে ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছেন, তা ব্যতিক্রমী। একজন মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বহু মূল্যবোধের এক অসাধারণ উদাহরণ।’

১৯৮১ সালে চালু হওয়া প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড স্পেনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা। শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। প্রতিটি পুরস্কারের সঙ্গে রয়েছে ৫০ হাজার ইউরো অর্থমূল্য, একটি সনদ, একটি পদক এবং হোয়ান মিরোর নকশা করা ভাস্কর্য।

সেরেনা উইলিয়ামস, রাফায়েল নাদাল ও এলিউড কিপচোগের মতো ক্রীড়াবিদরাও অতীতে এই পুরস্কার পেয়েছেন। সেই তালিকায় এবার মেসির নাম যুক্ত হওয়া তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যোগ করল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

(ওএস/এএস/অক্টোবর ২৪, ২০২৬)