রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : অগ্রিম টাকা নিয়ে ছেলে ইটভাটায় না যাওয়ায় মা দীপালী মণ্ডলকে অপহরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি লুৎফরের দোকানের সামনে থেকে তাকে অপহরণ করা হয়।

অপহৃত দীপালী মণ্ডল(৫২) শ্যামনগর উপজেলার জেলেখালি গ্রামের পঞ্চানন মণ্ডলের স্ত্রী।

শ্যামনগর উপজেলার জেলেখালি গ্রামের একাদশী মণ্ডল জানান, তার ভাই জগদীশ মণ্ডল একজন ভাটা শ্রমিক। একই এলাকার শ্রীফলকাটি গ্রামের জিয়াদ আলীর ছেলে ভাটা সরদার আমজাদ হোসেন বরিশালের ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাইকে কিছু টাকা দিয়েছে দাবী করে গত বুধবার রাত ১০ টার দিকে তাদের বাড়িতে আসে। ভাইয়ের কাছে টাকা পাবে দাবি করে তার অবস্থান জানতে চায়। ভাই দুর্গা বিসর্জনে দেবহাটার টাউন শ্রীপুরে গেছে বলে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মাকে মুঠোফোনে ডেকে মাকে জেলেখালি লুৎফরের দোকানের সামনে যেতে বলে। সেখান থেকে ভাইয়ের উপস্থিতিতে কথা বলার জন্য মাকে হরিনগরে পুরাতন বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে জোরপূর্বক মটর সাইকেলে তোলে। পরে তাকে আশেক এলাহি মুন্নার বাড়ির পাশপ শ্রীফলাকাঠি টেকনিকাল স্কুল এণ্ড কলেজের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদ করায় তাকে হুমকি দেয় আমজাদ।

এসময় তিনি প্রতিবেশী মনোরঞ্জনের গাড়িতে বাড়ি যাওয়ার কথা বললে তাকে চলে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে তাকে শ্রমিক ভর্তি একটি বাসে উঠতে বাধ্য করা হয়। সেখানে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তারা ৯৯৯ এ ফোন দেন। বাসের নাম্বার জানতে চাইলে তাদেরকে জানানো সম্ভব হয়নি।

একপর্যায়ে তিনি,মামাত ভাই পরেশ, ইউপি সদস্য দেবব্রত,বিএনপি নেতা একরামুল হকসহ কয়েকজনকে নিয়ে থানায় যান তারা। থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ না নিয়ে তার ভাই কেন ভাটায় যাওয়ার কথা বলে যায়নি তার কৈফিয়ত চান তিনি। একপর্যায়ে পরদিন সকালে তাদেরকে থানায় যেতে বলে। মায়ের ভুয়া কল রেকডিং শুনিয়ে মা ও ভাই দুইজন ভাটায় কাজে যাওয়ার জন্য টাকা নিয়েছেন মর্মে সাজানো গল্প শোনান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফিউল আলম পাটোয়ারী।

শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে শ্যামনগর থানা থেকে তার ভাই পরেশকে কল করে থানায় যেতে বলা হয়। শনিবার ভোর সাড়ে তিনটায় তারা কয়েজজন থানায় যেয়ে এসআই৷ আনোয়ার হোসেন, ভাটা সর্দার আমজাদসহ মাকে দেখতে পান। একপর্যায়ে এসআই আনোয়ার হোসেন মাকে বিষয়টি নিয়ে বেশিদূর না এগোনোর জন্য পরামর্শ দিয়ে ঘটনার জন্য ক্ষমা চান। তবে আমজাদ খোশ মেজাজে ছিল। আমজাদ ভাই জগদীশের পাসপোর্ট বই আগে থেকে কেড়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন একাদশী মণ্ডল।

শনিবার বিকেলে নিজ বাড়িতে দীপালি মণ্ডল আমজাদ তাকে যেভাবে অপহরণ করে বরিশালের হিজলখালির কামালপুর ভাটায় নিয়ে যাওয়া হয় তার বর্ণনা দিতে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এক কাপড়ে থাকায় তাকে ভাটায় কাজ করার জন্য আমজাদ তাকে শাড়ি,সায়া ও ব্লাউজ কিনে দেয়। যদিও তিনি তা ব্যবহার করেননি। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, তার ছেলে অপরাধ করলে দায় মাকে নিতে হবে কেন? ছেলের পরিবর্তে তাকে অপহরণ করা হবে কেন। তিনি কি হিন্দু বলেই আমজাদ সাহস পেলো? অসুস্থতার কারণে থানা থেকে তিনি তার মেয়ের বাড়িতে চলেবগেলেও শনিবার আমজাদ তাকে ফোন করে মুনসুর সরদারের গ্যারেজ মোড়ে যেতে বলেন। অন্য ভাটা৷ সর্দারের কাছে না গেলে ফল ভালো হবে না বলে তাকে শাসানো হয়। তিনি আমজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করেন।

জেলেখালি গ্রামের হাবিবুর রহমান,এনামুলনহক,গিরেন মণ্ডল,উদয় মণ্ডলসহ কয়েকজন জানান,কেউ অপরাধ করলে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও থানা আছে। সেখানে বিচার না দিয়ে ছেলের অপরাধে মাকে তুলে নিয়ে যাওয়া আমজাদের বড় অন্যায়। এর বিচার হওয়া দরকার।

আমজাদ হেসেন জানান, দীপালী মণ্ডলকে তিনি জোর করে নিয়ে যাননি ভাটায় জগদীশের পাসপোর্ট বই তার জিম্মায় আছে স্বীকার করে বলেন, জগদীশ কে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তার মা জানে পুলিশের কথামত দীপালি মণ্ডলকে থানায় নিয়ে আসেন তিনি।

পশ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানান, মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশের সহায়তায় দীপালি মণ্ডলকে ফিরিয়ে এনে তার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফউল ইসলাম পাটোয়ারীর কাছে জানতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় জেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

(আরকে/এএস/অক্টোবর ২৫, ২০২৬)