মানিক লাল ঘোষ


বাঙালি হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান পবিত্র অনুষঙ্গ দেবী শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর আরাধনা। ধন-ধান্য, শান্তি-সম্পদ, সৌভাগ্য ও মঙ্গলময় জীবনের আকুল প্রার্থনায় কোজাগরী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে ঘরে ঘরে দেবীকে আবাহন করা হয়। সনাতন শাস্ত্রে দেবী লক্ষ্মী কেবল অর্থের দেবী নন; তিনি ঐশ্বর্য, প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য, কান্তি ও পরম কল্যাণের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর পূজার মধ্য দিয়ে মানুষ কেবল পার্থিব প্রাচুর্য কামনা করে না; বরং সংসারে পরম শান্তি, জীবনে স্থিতিশীলতা এবং আত্মিক মঙ্গলের জন্য দেবীর চরণে বিনম্র অর্ঘ্য নিবেদন করে।

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহামিলনের আনন্দঘন আবহের পর শরৎ পূর্ণিমার জোছনাপ্লবিত রাতে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা প্রতিটি পরিবারে এক পরম পবিত্র ও স্নিগ্ধ পরিবেশের সৃষ্টি করে। গৃহ অঙ্গন ধৌতকরণ, চালের গুড়োর নিখুঁত আলপনায় দেবীর শ্রীচরণ অঙ্কন, প্রদীপ প্রজ্বালন, নবান্নের নতুন ধানের শিষ, ফলমূল ও নৈবেদ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বাঙালির আবহমান ধর্মীয় সংস্কৃতি। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলায় ধানের গোলা ও ফসলের খেতের সঙ্গে দেবী ধান্যলক্ষ্মীর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষকের মুখে হাঁসি, পরিবারের সচ্ছলতা এবং সামষ্টিক সমৃদ্ধিই লক্ষ্মীপূজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে সার্থক করে তোলে।

‘কোজাগরী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ— ‘কে জেগে আছ?’ প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কোজাগরী পূর্ণিমার নিশীথে দেবী লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে আগমন করেন এবং সজাগ ও কর্মঠ মানুষের গৃহে কৃপাদৃষ্টি বর্ষণ করেন। তবে এই ‘জাগরণ’ কেবল চোখের ঘুম ভাঙা নয়; শাস্ত্রের আলোয় এটি আত্মার জাগরণ, বিবেকের জাগরণ। দেবীর বাহন ‘পেঁচা’ যেমন অন্ধকারের মধ্যেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জাগ্রত রাখে, তেমনই মানুষকেও মোহাচ্ছন্নতা ও অন্যায়ের অন্ধকারে নিজের নীতি, সততা ও মানবিক বোধকে সজাগ রাখতে হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অসততা প্রত্যাখ্যান করা, আর্তের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজ দায়িত্বে নিষ্ঠাবান থাকাই হলো প্রকৃত কোজাগরী জাগরণ।

হিন্দু দর্শনে ধনসম্পদের ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক। শাস্ত্রমতে, ‘অষ্টলক্ষ্মী’র কৃপা ছাড়া জীবন পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না—যার মধ্যে বিদ্যা, ধৈর্য, বিজয়, শস্য ও সৎভাব অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অধর্ম বা অসততার উপার্জনে যে সম্পদের প্রাচুর্য আসে, শাস্ত্রে তা ‘অলক্ষ্মী’র রূপ। অসৎ ধনে সাময়িক চাকচিক্য থাকলেও তাতে আত্মিক শান্তি বা পারিবারিক মঙ্গল থাকে না। পরম পুরুষ নারায়ণের নীতি অর্থাৎ ধর্ম ও সততা যেখানে বিরাজ করে, সেখানেই লক্ষ্মী অচলা হয়ে অবস্থান করেন। একজন কৃষক যখন তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, শ্রমিক যখন গায়ের ঘাম ফেলার পর সঠিক পারিশ্রমিক পান, শিক্ষার্থী যখন জ্ঞানের আলো লাভ করে—তখনই সমাজে দেবীর প্রকৃত প্রসাদ বা সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়।

দেবী লক্ষ্মী আরাধনার শিক্ষাকে তাই কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে গণ্ডিবদ্ধ রাখা যায় না। বৈদিক ঐতিহ্যে সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি তার দাতব্য ব্যবহার ও পরোপকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আনন্দের দিনগুলোতে সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হলো পূজার সর্বশ্রেষ্ঠ উপচার। ক্ষুধার্তকে অন্নদান, অসুস্থের চিকিৎসায় সাহায্য করা এবং নিঃস্ব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো—সব পরম মানবিক কাজের মাঝেই দেবী লক্ষ্মীর জীবন্ত উপস্থিতি অনুভূত হয়।

দেবী লক্ষ্মী নারীশক্তিরও এক পরম প্রতীক। তাই তাঁর আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে বাস্তবে নারীর সমমর্যাদা, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে। যে সমাজে নারীকে সম্মান করা হয়, নারীশিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা উৎসাহিত হয়, সেখানেই লক্ষ্মীর কৃপা বর্ষিত হয়। পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে নারীর অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়াই হোক এই পূজার অন্যতম বার্তা।
বাংলাদেশের সামাজিক ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পেক্ষাপটে লক্ষ্মীপূজার অপর এক অনন্য মাত্রা হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের মাটি বহুধর্ম ও বহু মতের মানুষের সহাবস্থানে সমৃদ্ধ। উপাসনার পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা অভিন্ন—শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার। ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসবের আনন্দ এবং নাগরিক অধিকার সবার। একটি কল্যাণমুখী অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সংস্থান নিশ্চিত হওয়া আবশ্যিক। আমাদের সম্প্রীতি যেন কেবল আনুষ্ঠানিক বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক বন্ধনে ও দৈনন্দিন আচরণে মূর্ত হয়ে ওঠে।

এমনকি বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, খাদ্যের অপচয় রোধ করা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করাও দেবী বসুন্ধরা ও লক্ষ্মী আরাধনারই অংশ। প্রকৃতির দেওয়া সম্পদের দায়িত্বশীল ও সংযমী ব্যবহার আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

লক্ষ্মীপূজার প্রদীপ কেবল আমাদের গৃহকে আলোকিত করে না, তা যেন আমাদের অন্তরের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে মানবিকতার দীপশিখা জ্বেলে দেয়। যে পরিবারে সততা আছে, যে সমাজে ন্যায়বিচার আছে এবং যে রাষ্ট্রে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত—সেখানেই দেবী লক্ষ্মীর স্থায়ী নিবাস।

শ্রীশ্রী লক্ষ্মী দেবীর চরণে আমাদের আকুল প্রার্থনা—বাংলার কৃষকের গোলা ভরে উঠুক ধানে, শ্রমজীবী মানুষের ঘরে আসুক স্বস্তি, তরুণদের সামনে উন্মুক্ত হোক কর্মের নতুন দিগন্ত। প্রতিটি শিশু পাক শিক্ষার আলো, প্রতিটি নারী পাক পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মান, আর সমাজ থেকে চিরতরে দূর হোক দারিদ্র্য, দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার কালছায়া।

আসুন, পূজার এই মহাপবিত্রময় লগ্নে আমরা অঙ্গীকার করি—শুধু নিজের ভবনের আলো নয়, সমগ্র সমাজের অন্ধকার দূর করতে কাজ করব। সাম্য, শান্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও পূর্ণ মানবিকতার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। শুভ লক্ষ্মীপূজা। দেবী লক্ষ্মীর অমল কৃপায় সবার জীবন সুখ, শান্তি ও মঙ্গলে ভরে উঠুক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।