মাদারীপুর প্রতিনিধি : মাদারীপুরের কালকিনিতে তাইজুল সরদার হত্যার ঘটনার জেলে উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, সৌদি আরব প্রবাসীর ঘরসহ প্রায় ১৯টি ঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এসময় অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। 

আজ সোমবার সকালে এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। উত্তেজনা থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে।

পুলিশ, স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর সকালে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বাজারে মাদারীপুর সদর উপজেলার ‘চর কুলপদ্বী’ এলাকার মৃত রুস্তুম আলী সরদারের ছেলে তাইজুল সরদার (২২) বোরকা পরে হামলা চালাতে গিয়ে নিজেই নিহত হন। ২২ অক্টোবর সকালে কালকিনির কালিগঞ্জ বাজারের হানিফ হাওলাদারের চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন মহসিন ও জহিরসহ কালকিনির আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাফিজুর রহমান মিলন সরদার। এ সময় ইজিবাইকযোগে বোরকা পড়ে আসেন তাইজুল সরদারসহ আরো দুইজন। তারা প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জহির ও মহসিন নামে দুইভাইকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে স্থানীয়রা ধাওয়া দিয়ে তাইজুল ও আল আমিন নামে দুইজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এই ঘটনায় হামলা করতে আসা তাইজুল সরদার মারা যান। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা দেখা যায়।

এরই জেরে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিহত তাইজুল সরদারের পক্ষে কয়েকশ লোকজন এক যোগে কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালীনগর ও টুংমচর গ্রামে হামলা চালায়। প্রথমে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতংক ছড়ায়। এরপর কালকিনির আলীনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাফিজুর রহমান মিলন সরদারের একই ইউনিয়নের কালীনগর গ্রামের বসতঘরসহ টুংমচর গ্রামের নুরু হাওলাদারের ছেলে সৌদি আরব প্রবাসী আলী হোসেন হাওলাদার, বরকত হাওলাদার, মফিজুল হাওলাদার, রহিম হাওলাদার, মৃত মজিদ হাওলাদারের ছেলে লোকমান হাওলাদার, লুৎফর হাওলাদার, দুলাল হাওলাদার, আজিজ সরদারের ছেলে সৌদি আবর প্রবাসী ইদ্রিস সরদার, রুমান আকন, আউয়াল চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, জহির চৌকিদার, মহসিন চৌকিদার, আজিম চৌকিদার, জসিম চৌকিদারসহ প্রায় ১৯টি ঘরে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও ভাংচুর করা হয়। পরে আবারও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত হামলাকারীরা সরে পরেন।

এদিকে তাইজুল হত্যার ঘটনার পর গ্রেফতার আতংকে গ্রামের অনেক পুরুষ বাড়িতে না থাকার সুযোগে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় এলাকায় আতংক দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে কালকিনি থানা পুলিশ ও কালকিনি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকায় উত্তেজনা থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে।

নাম না প্রকাশে স্থানীয় ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী জানান, তাইজুল সরদার হত্যার ঘটনার পর থেকেই আমরা আতংকের মধ্যে ছিলাম। আমরা কোন দল করি না, কোন কিছুর সাথে জড়িতও না। তবুও কেন আমাদের ঘরবাড়ি এভাবে লুটপাট করা হলো। কেন আগুন দেয়া হলো। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।

ভুক্তভোগী নুরুন্নাহার বেগম বলেন, সকালে কোন কিছু বোঝার আগেই শত শত মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে আমাদের বাড়ি ঘরের উপর হামলা চালায়। আমরা ভয়ে কোন রকম পালিয়ে প্রাণে বেচে যাই। আমাদের ঘরের সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে, ভাংচুর করেছে আবার যাবার সময় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন পথে বসে গেছি। তাছাড়া আমার চার ভাই সৌদি আরব থাকেন। ঘরে শুধু আমার মা থাকেন। আমরা কোন কিছুর সাথেই জড়িত না। অথচ আমার চার ভাইয়ের ঘরে লুটপাট ও ভাংচুর করে আগুন দেয়া হয়েছে। এই ঘটনার বিচার চাই আমরা।

ভুক্তভোগী স্বর্ণ আক্তার বলেন, তাইজুল হত্যার ঘটনার জেরে সকালে এক সাথে নারী-পুরুষসহ বহু মানুষ এসে এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘর থেকে সব জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। ট্রাকে করে তারা ঘরের ফ্রিজসহ মালপত্রও নিয়ে গেছে।

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, লুটপাট, ভাংচুর ও আগুন দেয়ার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এই এলাকায় উত্তেজনা থাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(এএসএ/এসপি/অক্টোবর ২৬, ২০২৬)