মোংলা বন্দর চ্যানেলে ফের কয়লাবাহী কার্গোডুবি, সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা
বাগেরহাট প্রতিনিধি : মোংলা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের পশুর চ্যানেলে তলাফেটে আবারও কয়লা বোঝাই একটি লাইটার কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রায় ১২০০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই কার্গো জাহাজ পশুর চ্যানেলের লাইটার জাহাজ এমভি ফুলবাড়ী ডুবো চরে ধাক্কা খেয়ে তলা ফেটে ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া লাইটার জাহাজটি মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া ১৪ নম্বর বয়ার কাছে অবস্থানরত মাদার ভেসেল এমভি অবজারভেটরি থেকে প্রায় ১২০০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই করে যশোরের নওয়াপাড়ার উদ্দেশে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত কোস্টগার্ড ও মোংলা বন্দরের উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় জাহাজে থাকা সাতজন নাবিক ও কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করেছে। নতুন করে লাইটার কার্গো জাহাজ ডুবির ঘটনায় পশুর চ্যানেলে জাহাজসহ নৌযান চলাচল শঙ্কা ও দুর্ঘটনাস্থলটি সুন্দরবনের কাছে হওয়ায় পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এনিয়ে গত তিন বছরে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে এক হাজার মেট্রিক টন নিয়ে এমভি আইচগাতি, ১২৩৫ মেট্রিক নিয়ে এমভি জাবালে নূর, ৮০০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে এমভি বিডি-১১৪৮সহ ছয়টি কয়লা বোঝাই জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের কাছে পশুর চ্যানেলে কয়লা বোঝাই একটি লাইটার কার্গো জাহাজ ডুবির পর মঙ্গলবার সকালেই দূর্ঘটনাস্থলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে একটি দল পাঠানো হয়েছে। কয়লা পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে কি না। কয়লায় সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শফিকুল ইসলাম এতথ্য নিশ্চিত করে জানান, ডুবে যাওয়া লাইটার জাহাজ এমভি ফুলবাড়ী মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া ১৪ নম্বর বয়ার কাছে অবস্থানরত মাদার ভেসেল এমভি অবজারভেটরি থেকে প্রায় ১২০০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই করে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে যশোরের নওয়াপাড়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের ভূল পথে প্রবেশ করায় লাইটার জাহাজটি একটি ডুবোচরে আটকে তলদেশ ফেটে যায়। পরে রাতের জোয়ারের পানিতে কয়লা বোঝাই লাইটার জাহাজটি ধীরে ধীরে ডুবে যায়। লাইটার কার্গো জাহাজটি কয়লা বোঝাই করে মোংলা থেকে যশোরের নওয়াপাড়ায় যাচ্ছিল।
তবে, কয়লা বোঝাই লাইটার কার্গো জাহাজটিতে থাকা সাতজন নাবিক ও কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করেছে। কয়লা বস্তাবন্দী থাকায় আপাতত তা পানিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কম। বর্তমানে পশুর চ্যানেল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ডুবে যাওয়া লাইটার কার্গো জাহাজটির মালিকপক্ষকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নিজ খরচে বন্দর চ্যানেল থেকে জাহাজটি উত্তোলনের নির্দেশ দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইটার কার্গো জাহাজটি উদ্ধার করা না হলে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হবে বলেও জানান এই বন্দর কর্মকর্তা।
উদ্ধার হওয়া নাবিকারা জানান, কয়লা বোঝাই করে মোংলার পশুর চ্যালেন দিয়ে যশোরের নওয়াপাড়া যাওয়ার পথে সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাড়বাড়িয়া ও ইসমাইলের চর এলাকার মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছালে হঠাৎ বিকট শব্দে লাইটার কার্গো জাহাজটি কেঁপে ওঠে। তলা ফেটে এটি কাত হয়ে ডুবতে শুরু করে। আমরা ৭জনই লাফ দিয়ে পানিতে পড়ি। স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় কোস্টগার্ড ও মোংলা বন্দরের উদ্ধারকারী জাহাজের কর্মীরা আমাদের ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে।
মোংলার লাইটার কার্গো জাহাজের নাবিক ও নৌযান শ্রমিকরা বলছেন, বন্দরের পশুর চ্যানেলে পলি জমে অসংখ্য ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। কিছু লাইটার জাহাজের মাস্টার পুরোনো নৌ-চার্ট ব্যবহার করছে। এই পথটি সংক্ষিপ্ত হওয়ায় ঝঁকিপূর্ণ চলাচলের ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। পশুরের মূল চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং ও ডিজিটাল মার্কিংযুক্ত বয়া স্থাপন করা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হবে বলেও জানান তারা।
(এস/এসপি/অক্টোবর ২৭, ২০২৬)
