সাতক্ষীরায় 'জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরাম' গঠন
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করার দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাতক্ষীরায় গঠিত হয়েছে ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ফোরাম’। একই সাথে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর খাদ্য ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করতে দক্ষতা উন্নয়ন, শোভন আয়, কর্মসংস্থান ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছে নবগঠিত এই ফোরাম।
আজ শনিবার সকালে সাতক্ষীরার মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্টের ‘স্বর্ণলতা ক্যানটিন হলরুমে’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১ দফা দাবিতে ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন ঘোষণাপত্র’ উপস্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফোরামের সদস্য সচিব সোনিয়া খাতুন। সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি ফাতেমা বেগম এবং সঞ্চালনা করেন স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন 'স্বদেশ'-এর নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় দুর্যোগ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা গওহার নঈম ওয়ারা, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড নেটওয়ার্ক (প্রান)-এর প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মশাররফ এবং সিইপিআর-এর প্রধান নির্বাহী গোরাঙ্গ নন্দী সহ নাগরিক সমাজ, অধিকারকর্মী ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে বহু পরিবার সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আনুমানিক ৭ হাজার ৫৭৩টি বাস্তুচ্যুত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত উল্লেখযোগ্য ১১ দফা দাবি স্থায়ী আবাসন সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং আইনি নিরাপত্তা প্রদান করা। উচ্ছেদ বন্ধ বিকল্প পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছাড়া যেকোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখা। জীবিকা ও কর্মসংস্থান নারী, পুরুষ ও তরুণদের জন্য শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ এবং শোভন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি। খাদ্য সুরক্ষা জরুরি খাদ্যসহায়তা প্রদান, ন্যায্যমূল্যের খাদ্য সরবরাহ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি। স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন শিশু ও মাতৃত্বকালীন পুষ্টিসেবা, নিরাপদ খাবার পানি এবং উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা। নাগরিক অধিকার জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার নিবন্ধন, শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা এবং ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিতকরণ। বাজেটে স্বীকৃতি নগর ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় বাস্তুচ্যুত মানুষের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং তথ্যভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন।
সংবাদ সম্মেলনে ফরমের সভাপতি ফাতেমা বেগম বলেন "জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বস্ব হারিয়ে আজ আমরা নিজের ভিটামাটি ছেড়ে শহরের বসতিতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছি। আমরা কেবল কোনো ত্রাণ চাই না; নাগরিক হিসেবে নিরাপদ আবাসন, শোভন জীবিকা এবং খাদ্য-পুষ্টি আমাদের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার আদায়ে ফোরাম সর্বস্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে কাজ করবে।"
ফরমের সদস্য সচিব সোনিয়া খাতুন বলেন "সাতক্ষীরা পৌরসভার ৪৭টি বসতিতে সাড়ে সাত হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত পরিবার সংকটে বাস করছে। আমাদের ১১ দফা দাবি কেবল আশ্বাস নয়—খাসজমিতে স্থায়ী আবাসন, উচ্ছেদ বন্ধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এই দাবিগুলো অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।"
স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত, বলেন "জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার ঘোষিত 'অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১' বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আমরা কাজ করে যাব।"
সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা পুনর্ব্যক্ত করেন, জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী কেবল করুণার পাত্র বা সহায়তার গ্রহীতা নন, তাঁরা এ দেশের পূর্ণ নাগরিক। তাঁদের অধিকার আদায় এবং জাতীয় কৌশলপত্র বাস্তবায়নে ফোরামটি জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
(আরকে/এসপি/অক্টোবর ৩১, ২০২৬)
