বিকাশ স্বর্ণকার, সোনাতলা : মাথার ওপর নেই কোনো ছাউনি, নেই সেলুনের ঝকঝকে আয়না-চেয়ার। নেই বিদ্যুৎ, নেই আধুনিক সরঞ্জামের আয়োজন। আছে শুধু কাঁচি, চিরুনি, ক্ষুর আর জীবিকার তাগিদ। কখনো প্রখর রোদ, কখনো বৃষ্টি, সবকিছুকে সঙ্গী করেই খোলা আকাশের নিচে মানুষের চুল-দাড়ি কাটছেন কয়েকজন নরসুন্দর। একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ কর্মস্থলের অভাবে বছরের পর বছর এভাবেই চলছে তাদের জীবন-জীবিকা।

এমন দৃশ্য চোখে পড়লো বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বালুয়াহাটে। যদিও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে দেখা মেলে এমন চিত্রের। প্রতি শুক্রবার ও মঙ্গলবার বালুয়াহাটে এছাড়াও বুধবার ও শনিবার পাকুল্লা হাটে ও রোববার ও বৃহস্পতিবার সৈয়দ আহম্মেদ কলেজ হাট ও করমজা হাটের পথের ধারে অল্প কিছু সরঞ্জাম নিয়ে বসেন এসব নরসুন্দর। খোলা আকাশের নিচেই চলে তাদের কাজ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারের রাস্তার পাশে ছোট্ট জায়গায় বসে একজন খদ্দেরের চুল কাটছেন, আরেকজন পরবর্তী খদ্দেরের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের ব্যবসার পুজি বলতে কাঁচি, চিরুনি ও ক্ষুরই তাদের কর্মস্থলের সম্বল। দূর থেকে দৃশ্যটি সাধারণ মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এর পেছনে রয়েছে বংশ পরম্পরায় একটি পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব নরসুন্দর চুল কাটার জন্য নেন ১৫/২০ টাকা এবং দাড়ি সেভ করতে নেন ১০ টাকা। স্বল্প আয়ের এই কাজ থেকেই কোনোভাবে সংসারের খরচ চালাতে হয় তাদের। তবে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ কর্মস্থলের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। প্রখর রোদে মাথার ওপর কোনো ছাউনি থাকে না। আবার বৃষ্টি নামলে কাজ বন্ধ রেখে যেতে হয় নিরাপদ স্থানে। কখনোবা বৃষ্টিতে ভিজেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। এতে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি কমে যায় দিনের আয়ও।

নরসুন্দর পান কৃষ্ণ শীল বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরাও নরসুন্দর পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বংশ পরম্পরায় তারাও একই পেশা ধরে রেখেছেন। এই কাজ করেই সংসারের খরচ চালাতে হয়। সময় বদলালেও তাদের কর্মপরিবেশের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা কারও অনুগ্রহ চাই না। কাজ করার জন্য শুধু একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত জায়গা চাই। সেখানে রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা নিয়ে মানুষের সেবা দিতে পারলে আমাদের জন্য অনেক উপকার হবে।

স্থানীয় এক মুরুব্বি বলেন, খোলা আকাশের নিচে বসে এসব নরসুন্দরের জন্য ছোট একটি নির্দিষ্ট জায়গা ও ছাউনির ব্যবস্থা করা হলে তাদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি বাজারে আসা মানুষও সহজে তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে পারবেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, যুগের পর যুগ মানুষের চুল-দাড়ি কাটার মতো প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে আসছেন এসব নরসুন্দর। অথচ আজও তাদের কর্মস্থল খোলা আকাশের নিচে। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। তাদের জন্য একটি ছোট্ট নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি করা খুব বড় কোনো দাবি নয়।

সচেতন মহল মনে করছে, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে বাজারের সুবিধাজনক স্থানে এসব নরসুন্দরের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মস্থল ও ছাউনি তৈরি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশাটিও পাবে কিছুটা স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা।

(বিএস/এসপি/নভেম্বর ০৩, ২০২৬)