রাজন্য রুহানি, জামালপুর : জামালপুরের এমএ রশীদ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অংশ অপসারণ এবং পেটের নাড়ি ছিদ্র করার মামলায় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে তদন্ত শুরু হবে।

অভিযুক্ত দুই চিকিৎসক হলেন হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বরকত ও জেনারেল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। রোগী ও তাঁর স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে তাঁদের সম্মতি ছাড়াই রোগীর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। একই সময়ে পেটের তিন স্থানে নাড়ি ছিদ্র হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এসব জটিলতার কারণে রোগীকে দেশে ও ভারতে একাধিকবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলামকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রাশেদা পারভীন, মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. দেলোয়ার হোসেন, চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. রোকসানা আক্তার এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জুনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিছুর রহমান।

কমিটিকে সরেজমিনে তদন্ত করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জামালপুর সদর উপজেলার একাডেমিক সুপারভাইজার সাবেরী শারমিন গত ২০ জানুয়ারি তলপেটে ব্যথা নিয়ে এম. এ. রশীদ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, তাঁর ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ে সংক্রমণ রয়েছে এবং ডান ডিম্বাশয়ে রক্তভর্তি সিস্ট হয়েছে। পরে ২৯ জানুয়ারি ডা. সাবরিনা বরকত ও ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়।

রোগী ও স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচারের আগে তাঁদের সম্মতি নেওয়া ছাড়াই সাবেরী শারমিনের জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়। তবে সেগুলোর কিছু অংশ শরীরে থেকে যায়। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের সময় পেটের তিন স্থানে নাড়ি ছিদ্র হওয়ার কারণে তাঁর শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ তাঁদের।

অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বজনেরা তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যান। পরদিন সেখানে তাঁর দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। স্বজনদের দাবি, পপুলার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আগের অস্ত্রোপচারে জটিলতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অবস্থার আরও উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তৃতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়। কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখার পর ২০ জুন একই হাসপাতালে তাঁর চতুর্থবার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

রোগী ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এম. এ. রশীদ হাসপাতালে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে দেশে ও ভারতে চিকিৎসা করাতে তাঁদের মোট প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরে সাবেরী শারমিন অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে জেলা সিভিল সার্জনকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

এদিকে মামলার পর জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি আগামী বৃহস্পতিবার থেকে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা, অস্ত্রোপচারে চিকিৎসাপদ্ধতি এবং রোগীর শারীরিক জটিলতার কারণ খতিয়ে দেখে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ।

(আরআর/এসপি/নভেম্বর ০৪, ২০২৬)