ডেভিড হার্স্ট-এর বিশ্লেষণ
ট্রাম্প যুগের অবসান, বিশ্ববাসীর বিষয়টি মনে রাখা উচিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব ও নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল- সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এসব ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছিলেন। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কলাম লেখক ডেভিড হার্স্টের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ভুল। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সবার আগে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ ইরান যুদ্ধকে মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ বিদেশি সংঘাত হিসেবে দেখেছে। ফলে তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে।
ডেভিড হার্স্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের প্রভাব পারস্য উপসাগরের দুই তীর ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এই যুদ্ধের বড় পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থি প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু গাজার পরিস্থিতির পর এসব সংগঠনের রাজনৈতিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্য বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ভোটার, প্রগতিশীল জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মধ্যে ইসরায়েলবিষয়ক মার্কিন নীতির সমালোচনা জোরালো হয়েছে।
এদিকে এসব আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমর্থন পাওয়া মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আব্দুল আল-সায়েদের রাজনৈতিক উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ডেভিড হার্স্ট। তার দাবি, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স সায়েদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক বলে অভিযুক্ত করেছিলেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে হাউস স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী ন্যান্সি পেলোসিও সায়েদের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলপন্থি সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক নির্বাচনে প্রায় তিন কোটি ডলার এবং সাধারণ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমর্থন দিতে আরো প্রায় ৯০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল বলে উল্লেখ করেছেন হার্স্ট।
তার মতে, সায়েদের নির্বাচনী সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিষয়ক নীতি নিয়ে জনমতের পরিবর্তনকে সামনে এনেছে। তবে এ কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টি পুরোপুরি ইসরায়েলপন্থি অবস্থান থেকে সরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ইরান যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইস্যুতে জনমতের পরিবর্তন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এরই মধ্যে নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি শর্তহীন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন।
তবে খান্না ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার এবং জায়নবাদের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞাকেও সমর্থন করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও ইসরায়েলের টিকে থাকার অধিকার তিনি স্বীকার করেন। তবে বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণাকে সমর্থন করেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই অবস্থান ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং দখলদারত্বের অবসানের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং বিদেশে সামরিক সংঘাতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশটির নাগরিকদের বিভিন্ন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্পও নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তাঁর নির্বাচনী সভা এবং প্রার্থী বাছাইয়ে হস্তক্ষেপের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না আসায় তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন এবং অন্যদের নীরবতা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াইকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে টাকার কার্লসন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেসে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্পর্ক নিয়ে কঠোর তদন্তের সম্ভাবনার কথাও উঠেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের চার দিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালের ৪৯ শতাংশ মালিকানা কেনার জন্য ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প যুক্ত। ওই বিনিয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সংশ্লিষ্টতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্টের মতে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর দাবি বিশ্বরাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন কংগ্রেস এসব আর্থিক লেনদেন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে তদন্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কৌশল সাজিয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ডেভিড হার্স্টের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক সহযোগিতা, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কূটনৈতিক অবস্থানও নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইউরোপ নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেভিড হার্স্টের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে ইউরোপের উচিত নিজেদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীন কৌশল তৈরি করা। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতেও ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রভাব বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্তর্জাতিক আন্দোলন এবং জায়নবাদ নিয়ে বিতর্ক ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানকেও প্রভাবিত করছে।
ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আন্দোলন সহজে থেমে যাওয়ার নয় বলে মনে করেন ডেভিড হার্স্ট। তার মতে, গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি কিংবা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সাময়িকভাবে কমে যাওয়াকে এই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি দখলদারত্বের অবসান, ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান।
হার্স্টের বলেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমর্থনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—উদারপন্থি ডানপন্থি এবং মধ্য-বামপন্থি জায়নবাদী সমর্থন—এখন নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
(ওএস/এএস/নভেম্বর ০৬, ২০২৬)
