নাম বদলের রাজনীতি, ইতিহাস মুছে ফেলার বিপজ্জনক প্রবণতা
রাসেল আহমদ
সরকার পরিবর্তন হলে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বদলাতে পারে, বদলাতে পারে উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের ইতিহাস, জাতীয় স্মৃতি ও মুক্তিসংগ্রামের প্রতীকও বদলে যাবে -এমন রাষ্ট্রচিন্তা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তনের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা ক্রমেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ইতিহাসের নির্বাচিত পুনর্লিখনের উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
‘বিসিজিএস জয় বাংলা’র নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘বিসিজিএস অদম্য বাংলা’। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের নামে থাকা চারটি জাহাজের নাম বদলে রাখা হয়েছে যথাক্রমে ‘বিসিজিএস ফিরোজ কবীর’, ‘বিসিজিএস নুরুল ইসলাম’, ‘বিসিজিএস এম হুমায়ুন কবীর’ ও ‘বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী’। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত-৩ শাখার নির্দেশে এই পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী? নতুন জাহাজের নামকরণে সরকারের স্বাধীনতা থাকতেই পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতার নামে নামাঙ্কিত জাহাজগুলোর নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চায়? তাঁদের অপরাধ কি তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? নাকি তাঁদের নামের সঙ্গে স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকাটাই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অস্বস্তির কারণ? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে এই চার নেতা রাষ্ট্র পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকে সাংগঠনিক ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অবদান কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সম্পদ নয়; বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি শুধু চারজন রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড নয়, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার এক ভয়াবহ অধ্যায়। সেই চার নেতার স্মৃতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জাহাজের নামকরণ ছিল তাঁদের ঐতিহাসিক অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি উদ্যোগ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত তাই নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখে না। এর মধ্যে ইতিহাসের প্রতি রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারও প্রতিফলন রয়েছে।
একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নামকরণে দলীয়করণ হয়ে থাকলে তার সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক। ব্যক্তিপূজা কিংবা দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নামকরণও সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু একটি ভুলের সংশোধন আরেকটি ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করার যুক্তি হতে পারে না। জাতীয় চার নেতার নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁদের রাষ্ট্রীয় ভূমিকা দলীয় সীমানার ঊর্ধ্বে। তাঁদের অবদান মুছে দিয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা যাবে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় ইতিহাসের সর্বজনীনতা।
একই প্রবণতার আরেকটি প্রকাশ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ঘিরে বিতর্ক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি মামলার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টকে জানানো হয়েছিল, সরকার ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান বলে মনে করে না। অথচ আদালতের নির্দেশনার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। রাজনৈতিক সরকারের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে, আদালতের সিদ্ধান্তও আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচিত হতে পারে। কিন্তু ‘জয় বাংলা’র ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে কোনো সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ‘জয় বাংলা’ ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিরোধ, ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে, সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় ‘জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ’ পঙ্ক্তিতে শব্দবন্ধটির সাহিত্যিক ব্যবহারও পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ষাট ও সত্তরের দশকের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে এটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফলে ‘জয় বাংলা’কে কেবল আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে সংকুচিত করা ইতিহাসের সঙ্গে সুবিচার নয়।
এখানে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠে মেজর জিয়াউর রহমানও ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিএনপির জন্যও স্মরণীয় হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগানকে কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি ভাবার সুযোগ নেই। বিএনপি যদি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশীদার মনে করে, তাহলে সেই ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব, সংগঠক ও প্রতীকের প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে।
রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা কোনো সরকারের মেয়াদের ওপর নির্ভরশীল নয়। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্মৃতি জনগণের সম্পদ হিসেবে টিকে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, ঐতিহাসিক অবদান, জাতীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে মানদণ্ড করা প্রয়োজন। এ জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সর্বদলীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। তাতে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রেখে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পথ তৈরি হবে।
নইলে নাম পরিবর্তনের এই চক্রের শেষ কোথায়? আজ একটি সরকার পূর্ববর্তী সরকারের দেওয়া নাম মুছে দিচ্ছে, আগামী দিনে আরেকটি সরকার এসে বর্তমান সরকারের দেওয়া নাম মুছে দেবে। এভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় ইতিহাস ও স্মৃতির ধারক না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের প্রদর্শনীতে পরিণত হবে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে ইতিহাসের পরিচয় বদলানোর এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক দলের অর্জন নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মেজর জিয়াউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এই ইতিহাসের কোনো অংশকে অস্বীকার করে অন্য কোনো অংশকে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানোর চেষ্টা যেমন অন্যায়, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ইতিহাসের স্বীকৃতি মুছে দেওয়াও সমান অন্যায়।
রাষ্ট্রের কাজ নামফলক বদলে ইতিহাসের ব্যাখ্যা পাল্টানো নয়; বরং ইতিহাসের মর্যাদা ও সত্যকে ধারণ করা। প্রশাসনিক নির্দেশে জাহাজের নাম বদলানো যায়, কিন্তু জাতীয় চার নেতার অবদান কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ‘জয় বাংলা’র ঐতিহাসিক তাৎপর্য মুছে ফেলা যায় না। বরং এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ক্ষমতার সংকীর্ণতা ও ইতিহাসের প্রতি অসহিষ্ণুতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের পরিচয় ক্ষমতাসীন দলের পছন্দে নির্ধারিত হয় না; রাষ্ট্রের পরিচয় নির্মিত হয় তার ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসকে সেই সত্যের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সময় এখনই।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
