সরকারি ধান সংগ্রহ কাজে আসছে না কৃষকের
আগাম আমনের বাম্পার ফলনেও হতাশ ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ মাঠে এখন সোনালি ফসলের ঢেউ। এবার জেলায় ধানের ফলন ভালো হওয়ায় খুশি কৃষকরা। তবে তাদের খুশির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ কষ্ট। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে হতাশ তরা। উৎসবমুখর পরিবেশে ধান কাটলেও বাজারে আশানুরুপ দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছে কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কেউ ধান কাঁধে করে ঘরে তুলছেন, কেউবা মাড়াই করে করছেন চাল। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় তারা লাভের মুখ দেখতে পারছেন না। তবে কৃষকদের এই লোকসান এড়াতে ধান তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি না করে কিছুদিন সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।
দেশের উত্তরের কৃষিতে স্বনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁও সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার আমন ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান এখানকার কৃষকদের সরাসরি উপকারে না আসা এ অঞ্চলের কৃষিখাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তব সমস্যা। মাঠে ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় তাই সাধারণ কৃষকেরা একদিকে যেমন ফসল মাঠে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন অন্যদিকে কর্তণকৃত ঘরে তোলা এসব ফসলের বাজার মূল্য নিয়েও রয়েছেন চরম হতাশায়।
তবে কৃষকদের এই ভোগান্তির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি (জ্বালানি তেল, কীটনাশক এবং শ্রমিকের বাড়তি মজুরি) ও বাজারের নিম্নমুখী দর, দেরিতে সরকারী ধান চাল সংগ্রহ অভিযান এবং আড়তদার ও মিলারদের সিন্ডিকে কেই দায়ী করছেন কৃষিবীদ ও বিশ্লেষকরা।
সদর উপজেলার ভাউলারহাট এলাকার কৃষক জমির উদ্দিন জানান, আমি ৬ বিঘা জমিতে আগাম জাতের আমন আবাদ করেছি। এখন কেটে ঘরে তুলছি। ফলন খুব ভালো হওয়াতে প্রথমে খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু বাজার দর দেখে আর খুশি হতে পারছিনা। কারন উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে আমার তেমন আর লাভ থাকবেনা।
মহসিন নামের আরেক কৃষক জানান, প্রথমের দিকে বাজারে দু মণি বস্তার দাম ২২শ সাড়ে ২২শ থাকলেও এখন তা ২১শ তে এসেছে। দাম না বেড়ে আরো কমছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান যাচ্ছে এক হাজার ৫০ থেকে ১১শ টাকা। এটা যদি ১২শ থেকে ১৩শ টাকা হতো তাহলে দুমণি বস্তা গুলো আমরা ২৪শ থেকে ২৬শ টাকা পেতাম। ধানের দাম আর উৎপাদন খরচ সমান হয়ে যাচ্ছে প্রায়। এখন এ ধানের খড় টুকুই যা সম্বল। হয়তো এসব বেচেই কিছুটা লাভ তুলতে পারবো।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানাযায়, আমনের এ ভরা মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ২শ ৭০ হেক্টর জমি। বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৩শ হেক্টর জমি, যা লক্ষমাত্রার চেয়েওে ৩০ হেক্টর বেশি। জেলার বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যেই আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। স্থানীয় ও উফশী জাত মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা সম্পন্ন হয়েছে। উফশী জাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে ব্রি-ধান ৭৫, ব্রি-ধান ৯০, ব্রি-ধান ১৭ এবং ৭। এ ছাড়াও উফশী জাতের পাশাপাশি হাইব্রিড জাতের ধানও কাটা শুরু হয়েছে। যার মধ্যে ‘ধানি গোল্ড’ অন্যতম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মাজেদুল ইসলাম জানান, এই যে আগাম ধানতারা করে কর্তন শুরু করেছে এগুলো আমি মনে করি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ। কারন, কার্তিকের এ সময়টা মঙ্গার সময়। এই অঞ্চলের অভাব নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে। আগে এ সময় তেমন ফসল হতোনা। অথচো এখন উদ্ভাবিত নানা আগাম জাতের বদৌলতে কৃষকরা আগাম জাতের আমন ঘরে তুলতে পারছে। দাম কিছুটা কম পেলেও গোখাদ্য হিসেবে ধানের খড় বিক্রি করে তারা লাভবান হতে পারবে। এসময়টাতে গোখাদ্যের দাম বেশ বেড়ে যায়। সরকারিভাবে এখনো আমন সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। একটু অপেক্ষা করতে হবে।
সহকারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে বাজারে আগাম আমন ধান আসা শুরু করলেও কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আমরা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন ধান এখনই কম দামে বিক্রি না করে কিছু সময় বাড়িতে সংরক্ষণ বা মজুদ করে রাখেন। পরবর্তীতে বাজার বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ে ধান বিক্রি করলে উপযুক্ত দাম পাবেন তারা। তাছাড়া কোনো অসাধু চক্র বা মহল যেন কম দামে ধান কিনে মজুদ করে বাজারকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সেজন্য আমাদের নিয়মিত বাজার তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
(এফআর/এসপি/নভেম্বর ০৮, ২০২৬)
