E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নাটোরে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আদিবাসীরা সাংস্কৃতিক অধিকার হারাচ্ছে

২০২৫ ডিসেম্বর ২০ ১৮:২০:৪৯
নাটোরে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আদিবাসীরা সাংস্কৃতিক অধিকার হারাচ্ছে

অমর ডি কস্তা, নাটোর : নাটোরের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের নিজস্ব ও ঐতিহ্যের প্রথাগত সাংস্কৃতিক চর্চা এখন আর নিয়মিত নয়। ক্রমশঃ এই চর্চায় ভাটা পড়ছে। এতে ধীরে ধীরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যের জীবন্ত অধ্যায় সংকটাপন্ন হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে প্রবীণদের ইচ্ছে ও অনুপ্রেরণায় নবীন বা যুবরা অংশ নিলেও নিজ সম্প্রদায়ের নিজস্ব এই বিনোদন চর্চাতে বর্তমান প্রজম্মের তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব, নগরায়ন, ভাষার অবমূল্যায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের উৎসাহের অভাবই হচ্ছে এর মূল কারণ। তবে স্থানীয় আদিবাসী নেতারা বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন, আদিবাসী সাংস্কৃতিক চর্চা টিকিয়ে রাখার প্রতি সরকারের আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। তার প্রমাণ হিসেবে তারা বলেন, আদিবাসী সাংস্কৃতিক চর্চা টিকিয়ে রাখা বা চলমান রাখার ক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আদৌ আছে কিনা তা আপনারা (সাংবাদিকরা) প্রমাণ দেখিয়ে দিন। যুগ যুগ ধরে অধিকার বঞ্চিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী দেশের সাংস্কৃতিক অংশে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারা তুলে ধরারও অধিকার ক্রমশঃ হারাচ্ছে বলে জানায় তারা। তাদের মতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও একীভূত সমাজের সহযোগিতা ছাড়া এই সাংস্কৃতিক চর্চা ধরে রাখা সত্যিই কঠিন।

নাটোর জেলার গণমাধ্যম কর্মী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচিত মুখ কালিদাস রায় জানান, এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এক সময় সাঁওতাল, ওঁরাঁও, মুণ্ডা, মাহালি প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজস্ব ভাষা, পোশাক, নৃত্য, গান ও উৎসব পালনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখতো। কিন্তু সময়ের সাথে সেই প্রথাগত চর্চায় এখন স্পষ্ট ভাটা পড়েছে। তিনি আরও জানান, আগে আদিবাসী পল্লীগুলোতে বছরে বিভিন্ন উৎসব ঘিরে আয়োজন করা হতো সাংগঠনিক নৃত্য, বাঁশি ও ঢোলের তালে তালে ঐতিহ্যবাহী গান। বর্তমানে এসব আয়োজন কমে এসেছে বললেই চলে।

নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বয়স্ক আদিবাসীরা এখনো প্রথা রক্ষার চেষ্টা করছেন। তবে নতুন প্রজন্ম তা ধরে রাখতে অনীহা প্রকাশ করছে। অনেকেই জানায়, স্কুল-কলেজে এসব সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা বা শিক্ষা নেই। ফলে তারা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে আত্মপরিচয় তৈরির সুযোগ পাচ্ছে না।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকট, জমি হারানোর ভয় এবং সামাজিক নানা চাপে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চাকে উপেক্ষা করে বা পাশ কাটিয়ে জীবিকার দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া তরুণ প্রজন্ম শহর ও আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ায় তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রতি।

এই জেলার নাটোর সদর, সিংড়া, নলডাঙ্গা, লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসীর বসবাস। বহু প্রজন্ম ধরে এ জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব নিয়ম, রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে চলছে। প্রতি বছর পৌষ-পার্বণ, সিধু-কানু দিবস, বাহা উৎসব, সরনা ধর্মীয় পূজা, বড়দিন, বাংলা নববর্ষ, ইংরেজী নিউ ইয়ার এবং নানা কৃষিনির্ভর উৎসবকে ঘিরে পালিত হতো লোকজ সাংস্কৃতিক চর্চা। বাঁশি, ঢোল, কাঁসি, মাদল আর গানের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে নাচ এসব ছিল তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

স্থানীয় এক আদিবাসী নেতা মতিলাল বিশ্বাস বলেন, সংস্কৃতি শুধু অনুষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি আমাদের পরিচয়। এখন যে ভাটা পড়েছে সেটা আমাদের অস্তিত্বের উপর আঘাত। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আদিবাসী সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো উপস্থাপনা বা পরিবেশনার সুযোগ দেওয়া না হলে এই সাংস্কৃতিক চর্চায় ভাটা তো পড়বেই। আদিবাসী ওই নেতা আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিন্দি, তামিল ভাষার গান গায় বাংলাদেশীরা এবং বিভিন্ন নামী-দামী শিল্পীও স্টেজে হিন্দি গান গায়। অথচ আমাদের আদীবাসীদের একটি গানও গাইতে শুনি না। নৃত্য শিল্পীরা হিন্দি বা তামিল গান বাজিয়ে নৃত্য করে অথচ চাইলে আদিবাসী সংস্কৃতির গান বাজিয়েও তারা নৃত্য করতে পারে।

আদিবাসীদের নাচ-গান আদিবাসী ছাড়া অন্য গোষ্ঠীরা না করার কারণ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সদিচ্ছার অভাব। আদিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক চর্চা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন একীভূত সাংস্কৃতিক দপ্তর বা মোর্চা। অন্যথায় এই সাংস্কৃতিক ধারা এক সময় থেমে যাবে। আর এর ফলে বাংলাদেশে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়ও এক সময় হারিয়ে যাবে।

নাটোরে কর্মরত বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা নিডা সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক জাহানারা বিউটি জানান, আদিবাসী সাংস্কৃতিক চর্চা রক্ষায় সরকারের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ আছে বলে মনে হয় না। কিছু এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও তা নিয়মিত নয়। কোনো স্থায়ী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বা উৎসব বাজেট নেই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও। তিনি আরও বলেন, সরকারি পর্যায়ে নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া আদিবাসী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। স্কুল-কলেজে আদিবাসী ইতিহাস ও সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত করা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক দল গঠনের জন্য সহায়তা প্রদান এবং নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণের জন্য কাজ করা জরুরি।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় ক্রিশ্চিয়ান এইড, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট (উই ক্যান) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কর্তৃক সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়নকৃত এক্সপেন্ডিং সিভিক স্পেস থ্রু একটিভ সিএসও পার্টিসিপেশন এন্ড স্ট্রেন্দেন্ড গভার্নেন্স সিস্টেম ইন বাংলাদেশ প্রকল্প নাটোর জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। এই কাজে জেলায় স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগী সংস্থা হিসেবে সরাসরি কাজ করছে নিডা সোসাইটি, লাস্টার, পল্লী কল্যাণ শিক্ষা সোসাইটি (পিকেএসএস) ও অর্পা নামক সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও)।

জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহাদৎ হোসেন জানান, নাটোর জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তাদের জন্য সরকারী বিভিন্ন বরাদ্দ গুরুত্বের সাথে বন্টন করা হয়। এছাড়া অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদানে এই জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে তাদের সাংস্কৃতিক চর্চাকে চলমান বা জাগ্রত করতে বা রাখতে প্রথমে ওই জনগোষ্ঠীর সুশীল ব্যক্তি, নেতা, যুবদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকেই সরকারী বা বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করতে উদ্যোগ নিতে হবে।

এছাড়া অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সাংস্কৃতিক ধারা ছড়িয়ে দিতে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, সকল টেলিভিশন সহ গণমাধ্যম কর্মীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়া প্রয়োজন আদিবাসী সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ ও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসূচি চালু করার।

তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য কর্মসূচী পরিচালনাকারী আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট (উই ক্যান) সংস্থার চলমান কর্মসূচীর প্রশংসা করে ধন্যবাদ প্রদান করেন এবং একই সাথে সহযোগিতা প্রদানের জন্য বৈদেশিক দাতা সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সহযোগী সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি এই জেলায় কর্মসূচী বর্ধিত করার আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, এতদবিষয়সহ আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও উপযোগী উন্নয়নমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা এখন সময়ের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দাবি। যার যুগপোযোগী পদক্ষেপ গ্রহন ও সফল বাস্তবায়ন হোক-এটাই কামনা করি।

(এডিকে/এসপি/ডিসেম্বর ২০, ২০২৫)

পাঠকের মতামত:

১৬ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test