E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভোট আছে, অধিকার নেই

শিক্ষার আলো যেন মানতা শিশুদের বামুনের চাঁদ

২০২৬ জানুয়ারি ০৩ ১৮:৫৯:২৩
শিক্ষার আলো যেন মানতা শিশুদের বামুনের চাঁদ

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা : নদীই যাদের জন্মভূমি, নদীর ঢেউয়েই শৈশবের দোলনা, আর সেই নদীতেই জীবনের শেষ আশ্রয়—তারা মানতা সম্প্রদায়। উপকূলীয় নদী ও মোহনার বুকে ভাসমান ছোট ছোট নৌকাই তাদের ঘর, সংসার ও পৃথিবী। যেখানে অধিকাংশ মানুষ ডাঙার মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন বুনে, সেখানে মানতারা স্বপ্ন দেখে ঢেউয়ের ওপর ভেসে থেকে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেও এই জনগোষ্ঠীর জীবনে সেই আলো এখনো পৌঁছায়নি।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের সুইস গেট এলাকায় গেলে দেখা যায় নদীর বুকে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় একটি পরিবার—হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, জন্ম আর মৃত্যুর গল্প নিয়ে ভেসে থাকা একেকটি সংসার। ডাঙায় তাদের কোনো ঠিকানা নেই, নেই স্থায়ী আশ্রয়। ধর্মে তারা মুসলমান হলেও জীবনধারা ও সংস্কৃতিতে তারা আলাদা, প্রান্তিক। শিক্ষা, চিকিৎসা, নাগরিক পরিচয় কিংবা সরকারি সহায়তা—সবকিছুই যেন তাদের জীবনে অধরাই থেকে গেছে।

ইতিহাস বলছে, দেড়শ থেকে দুইশ বছর আগে শুরু হয়েছিল মানতা সম্প্রদায়ের এই ভাসমান জীবন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নদীর বুকে কাটিয়ে দিলেও তারা পায়নি এক টুকরো স্থায়ী ভূমি। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার মিলেছিল ঠিকই, কিন্তু ভোটের অধিকার পেলেও নাগরিক হিসেবে মৌলিক অধিকার আজও তাদের জীবনে অনুপস্থিত। নেই জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন, নেই শিশুদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ, অসুস্থ হলে নেই চিকিৎসার নিশ্চয়তা। নদীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করায় আজও নির্ধারিত হয়নি তাদের সঠিক জনসংখ্যা।

রহমজান নামের এক মানতা জেলে কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “আমাগো পরিবার মিলাইয়া প্রায় একশো জন হইবো। নৌকাই আমাগো ঘর। টাহা না থাকায় পোলাপান পড়াইতে পারি নাই। নদীতে গেলে খাই, না গেলে উপোস। কেউ যদি একটু সাহায্য করতো, বাচ্চাগো মানুষ করতাম, পড়াইতাম।”খোদেজা ভানুর জীবনের গল্পও আলাদা নয়। ক্লান্ত চোখে তিনি বলেন,

“মায়ের পেটে থাকতেই নৌকায় জীবন শুরু। ডাঙায় কোনো ঘর নাই। পাঁচটা সন্তান, সবাই জাল বাইয়া খায়। পড়ালেখার কথা ভাবার সুযোগই পাই নাই।”

শিরিনার কথায় ভেসে ওঠে অসহায়ত্ব, “আমরা নিজেরাই লেহাপড়া জানি না। বাচ্চাদের পড়াইতেও পারি না। স্কুল তো দূরে, নৌকার কাছে নাই। রাইতে তো স্কুল খোলা থাকে না।”

এখানে পেটের দায়ই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। পড়ালেখা যেন বিলাসিতা। বয়স দশ বা বারো হলেই শিশুরা বাবার সঙ্গে নৌকায় নামে মাছ ধরতে। নৌকাই তাদের শ্রেণিকক্ষ, নদীই পাঠশালা। ফলে অশিক্ষার বৃত্ত ভাঙে না—প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই অন্ধকারে ঘুরপাক খায়। রাষ্ট্র যখন দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ার কথা বলছে, তখন এই বিশাল জনগোষ্ঠী যেন চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে।

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, মানতা শিশুরা মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারছে না। তাদের বসবাসের কাছাকাছি ভাসমান বা বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা গেলে অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে তাদের জীবনমান বদলের একটি পথ তৈরি হতে পারে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেই বেঁচে থাকে মানতা সম্প্রদায়। মৃত্যুভয়, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মাঝেও তারা স্বপ্ন দেখতে চায়। তারা চায় ডাঙায় এক টুকরো ঘর, পরিচয়ের স্বীকৃতি, আর সন্তানদের হাতে বই। সুযোগ পেলে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই শিক্ষিত করতে চায় মানতা সম্প্রদায়ের প্রতিটি শিশুকে—এই স্বপ্ন বুকে নিয়েই নদীর বুকে ভেসে চলে তাদের জীবন।

(এসডি/এসপি/জানুয়ারি ০৩, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৫ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test