E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

টুঙ্গিপাড়ায় নববধূর মুখে বিষ ঢেলে হত্যার অভিযোগ, ৬ লাখে মিমাংসা

২০২৬ মার্চ ১১ ১৮:৪৭:৪৪
টুঙ্গিপাড়ায় নববধূর মুখে বিষ ঢেলে হত্যার অভিযোগ, ৬ লাখে মিমাংসা

তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন ও মুখে বিষ ঢেলে নুসরাত হোসেন সানজিদা ওরফে তন্নী (১৮) নামের এক নববধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। 

গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেছিলো ওই নববধূর বাবা জাহাঙ্গীর খান। কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি ৫ জন স্থানীয় ব্যক্তি সহ গোপালগঞ্জ এক উকিলের মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে লিখিতভাবে নববধূর শ্বশুর জাফর খানের সাথে ৬ লাখ টাকা নিয়ে হত্যার মিমাংসা করেন পিতা জাহাঙ্গীর খান। এর কয়েকদিন পর বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় শুরু হয় আলোচনা- সমালোচনা। আবার অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার চর-গোপালপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর খানের মেয়ে তন্নীর সাথে একই গ্রামের জাফর খানের ছেলে আরিফুল খানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। প্রায় ১ মাস আগে রাতের বেলায় আরিফুল তন্নীর সাথে দেখা করতে আসলে গ্রামের লোকজন তাদের ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়। তারপর থেকে তন্নীকে তাদের বাড়ি নেয়নি আরিফুল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নিজের ইচ্ছায় তন্নী স্বামীর বাড়ি যায়। পরদিন তন্নী বাবার বাড়ি এসে জানায় শ্বশুরবাড়ির পাশে দুই বিঘার একটি জমি লিখে দিতে হবে। ওইদিন শ্বশুরবাড়ি চলে চলে যায়। পরের দিন নির্যাতন ও মুখের বিষ ঢেলে বাবার বাড়ির সামনের রাস্তায় তন্নীকে ফেলে যায় স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তন্নী মারা গেলে বাবা জাহাঙ্গীর খান অভিযোগ করেছিলেন, তার মেয়েকে শারীরিক নির্যাতন করে ৪-৫ জনে মিলে মুখে বিষ ঢেলে হত্যা করেছে।

কিন্তু ঘটনার কয়েকদিন পর তারাইল-চরগোপালপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর শিকদার,
সোহেল শেখ, টুটুল শিকদার, পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়ার সোনাখালী সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার সহ তন্নীর বাবা শ্বশুর মিলে ৬ লাখ টাকায় হত্যার বিষয়টি মিমাংসা করে নেন। পরে মৃত তন্নীর বাবা সেই টাকা ব্যাংকে রেখে আসেন।

এবিষয়ে জানতে মিজানুর, সোহেল ও আনোয়ারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে মিমাংসায় উপস্থিত থাকা টুটুল শিকদার বলেন, মৃত তন্নীর বাবা হটাৎ আমায় এসে বলে গোপালগঞ্জ যেতে হবে। তখন গিয়ে দেখি গোপালগঞ্জের এ্যাডভোকেট রবিউল আলমের কার্যালয়ে বসে তন্বীর বাবা হত্যার বিষয়টি ৬ লাখ টাকায় লিখিতভাবে আপোষ মিমাংসা করেন । শ্বশুর জাফর খানের কাছ থেকে নগদ ৬ লক্ষ টাকা নিয়ে সাথে সাথে ব্যাংকে গিয়ে রেখে আসেন । এতে আমার কোন স্বার্থ নেই, এলাকার লোক হিসেবে ডেকেছে তাই গিয়েছিলাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁরাইল- চরগোপালপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, একটা হত্যার ঘটনা যদি ৫-৬ লাখ টাকায় মিমাংসা করা যায় তাহলে দেশে আইনশৃঙ্খলা থাকবে কিভাবে! যে কেউ কাউকে হত্যা করে ওই রকম টাকার বিনিময়ে মিটিয়ে ফেলবে। আর দোষীরাও হত্যা করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে।

এব্যাপারে তন্নীর বাবা জাহাঙ্গীর খান বলেন, এলাকার অনেক লোক অনেক কথা বলতেই পারে। কিন্তু এখনো কোন মিমাংসা হয়নি। আপনাদের (সাংবাদিক) নাম্বার দিয়ে যান মিমাংসা হলে আমি যোগাযোগ করবো।

তবে মৃত তন্নীর মা বলেন, আমার স্বামীকে নানা রকমভাবে হুমকি দিয়েছে ওরা। তাই সে ভয়ে মিমাংসা করতে চাচ্ছে। শুনেছি ৬ লাখ টাকার কথা হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা আমার স্বামী নিয়েছে কিনা জানিনা, আমাকে বলেওনি। আর উনি টাকা নিয়ে কি আমার মেয়ের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, বাংলাদেশে আইনত টাকার বিনিময়ে হত্যা মামলা আপোষ মিমাংসার কোন সুযোগ নেই। কারণ এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। যদি এরকম ঘটনা ঘটে থাকে এতে সমাজের উপর খারাপ প্রভাব পরে ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে না। তাই হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ ও মিমাংসায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী বলেন, ওই ঘটনায় টুঙ্গিপাড়া থানায় একটা অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মরদেহটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। যদি প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া যায়, তখন হত্যা মামলা হবে। তবে আইনগতভাবে হত্যার মতো ঘটনায় মিমাংসার কোন সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

(টিবি/এসপি/মার্চ ১১, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১১ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test