E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

লৌহজংয়ে এক দশক ধরে বিষাক্ত ধাতু গলানো অবৈধ কারখানা

চোরাই সিন্ডিকেট, প্রাণঘাতী জালিয়াতি ও মাদকের নিরাপদ আশ্রয়

২০২৬ আগস্ট ৩০ ১৮:১২:২৫
চোরাই সিন্ডিকেট, প্রাণঘাতী জালিয়াতি ও মাদকের নিরাপদ আশ্রয়

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোয়ালিমান্দ্রা থেকে কারপাশা অভিমুখে রাস্তার ডান পাশে গত ১০ বছর ধরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে এক বিষাক্ত কারখানা। লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে 'ট্রন্সফরমার ফ্যাক্টরি' নামে পরিচিত এই আস্তানায় কোনো ধরনের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা ফায়ার সার্ভিস ও শ্রম অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চলছে মারাত্মক পরিবেশবিনাশী কর্মকান্ড। উচ্চ সীমানা প্রাচীর ও নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে আবৃত এই দুর্ভেদ্য দুর্গে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি সংবাদকর্মী বা আইন প্রয়োগগকারী সংস্থার উপস্থিতি টের পেলেই নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভিতরে চলে মাদকের ব্যবসাও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকার আমলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে 'নান্টু' নামের এক ব্যক্তি কারখানাটি স্থাপন করেন। কয়েক মাস পূর্বে নান্টু অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমানোর পর তার স্ত্রীর মাধ্যমে এটি বিক্রি করেন মো. রানা, মজিবর এবং তার সহযোগী আলা আমিনের কাছে। বর্তমানে এ কারখানার মূল নিয়ন্ত্রক ও মালিক মজিবর রহমান।

প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক নিয়ে শুরু হয় কারখানার আসল কর্মযজ্ঞ। ৮ থেকে ১০টি ডাইস ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ইলেকট্রিক চুল্লিতে মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ তাপমাত্রায় গলানো হয় সংগৃহীত লোহা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও সিলভার। এসব ধাতুকে গলিয়ে পাটা তৈরি করে তা পুরান ঢাকার ধোলাইখালে মজিবর-আলামিন চক্রের নিজস্ব দোকানে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া পুরাতন ও অচল ট্রান্সফরমার এনে মারাত্মক ক্ষতিকারক এসিড দিয়ে ওয়াশ করে পুনরায় রঙ মেখে 'নতুন' হিসেবে বাজারজাত করছে এই চক্র। এতে ঝুকিতে থাকছে সাধারণ জনগণ।

কারখানাটিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রধান উৎস দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা চোর চক্র। সরকারি-বেসরকারি মোবাইল টাওয়ারের লোহা, বিদ্যুৎ সংযোগ টাওয়ারের নাট-বল্টু ও মোটা বিদ্যুৎ কেবল রাতের আঁধারে ট্রাকে করে এখানে এনে পৃথক করা হয়। রিফার্নিশড করা এসব নকল ও বিপজ্জনক ট্রান্সফরমার ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া হয়েছে ভয়াবহ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হলদিয়া ইউনিয়নের এই কারখানা থেকে একটি রিফার্নিশড ট্রন্সফরমার এনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সাথে সাথেই তা বিস্ফোরিত হয়। এতে একজন স্থানীয় বাসিন্দার পুরো শরীর মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। তবে চেয়ারম্যানের সাথে কারখানা মালিকের গোপন সমঝোতা থাকায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আইনের আলো দেখেনি।

অবৈধ ধাতু কারবারের পাশাপাশি গোয়ালিমান্দ্রা এলাকার প্রধান মাদক স্পট হিসেবে গড়ে উঠেছে এই কারখানা। আইনশৃঙ্খ রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর পেলে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা টাকা ও মাদকের চালানের নিরাপত্তায় এই আস্তানায় এসে আশ্রয় নেয়। রাতে কারখানার অভ্যন্তরে নিরাপদে বসে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবনের নিয়মিত আসর।

কারখানাটির এসব কর্মকান্ড বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার সরাসরি অবমাননা ও মারাত্মক অপরাধ।
এ বিষয়ে কারখাটির নির্বাহী বলে পরিচয়দানকারী মজিবর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, গত ৬-৭ মাস ধরে তারা এই কারখানটি ক্রয় করেছেন। তাদের কোম্পানির নাম অপটিমার ট্রাক ইঞ্জিনিয়ারিং। তারা আইএসও সনদ প্রাপ্ত। তারা কোন প্রাকার অবৈধ কাজ করেন না। তবে কারখানাটির আশেপাশে মাঝে মাঝে মাদক সেবী ও কারবারীরা ঝামেলা করে। তাদের সব ধরণের কাগজ পত্র রয়েছে বলে তিনি দাবী করলেও এক পর্যায়ে তিনি বলেন আবেদ করা হয়েছে।

তবে লৌহজংয়ের দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের ইনেস্পেক্টর আরিফ আনোয়ার জানান, এ নামে কোন কোম্পানির আবেদন এখনও তার কাছে এসে পৌছেনি। মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ এবং কলকারখানা অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে থেকেও কোন প্রকার সনদ গ্রহন করেনি এই কারখানাটি।
জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে অবিলম্বে এই অবৈধ কারখানায় অভিযান চালানো, সরঞ্জাম বাজেয়াাপ্ত করে আস্তানাটি সিলগালা করা এবং মূল হোতা মজিবর ও আলামিনসহ পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছে স্থানীয়রা।

(এমকে/এসপি/আগস্ট ৩০, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

৩০ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test