E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

শিরোনাম:

নীলফামারীতে পেট বিষা বিলের বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি

২০২১ মে ০৯ ১৭:১৫:৩৩
নীলফামারীতে পেট বিষা বিলের বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি

নীলফামারী প্রতিনিধি : নীলফামারী সদর উপজেলার খোকসাবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ কিসামত গোড়গ্রামে বহু পুরনো জলমহাল ‘পেট বিষা বিল’। সরকারি ওই জলাশয়কে দোলা (কৃষি জমি) দেখিয়ে ছয় পরিবারকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। জনস্বার্থে জলাশয়টি উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, দুই একর ৮০ শতকের ওই জলমহাল ঘিরে সচল রয়েছে এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে গ্রামের শতাধিক ভূমিহীন পরিবার। পানি ব্যবহার করে ফসল ফলাচ্ছেন কৃষক। কিন্তু জলাশয়টির সিংহভাগ (এক একর ৬৫ শতক) বন্দোবস্ত (৯৯ বছরের কবুলত দলিল) দেওয়া হয়েছে ছয়টি সচ্ছল পরিবারকে। তাদের মধ্যে পাঁচ পরিবার নিকটআত্মীয়।

এলাকাবাসীর পক্ষে গ্রামের আব্দুল লতিফ (৪৮) বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি ওই জলাশয় এলাকার মানুষ উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করে আসছেন। সেটিকে কুক্ষিগত করতে উঠে পড়ে লেগেছে ওই ছয় পরিবার। ২০১৯ সালে সেটির বেশিরভাগ অংশ কবুলিয়ত দলিল করে নিয়েছেন তারা। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জলাশয় রক্ষায় এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উপজেলা এবং জেলা প্রশাসনের কাছে দলিল বাতিলের আবেদন করে। এখন বিল রক্ষা এবং দখল নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।’

একই গ্রামের কৃষক জিতেন্দ্র নাথ রায় (৫০) বলেন, ‘ওই জলাশয়ের পাশে আমার দেড় একর কৃষি জমি আছে। আমার মত এলাকার শতাধিক কৃষক সেচকাজে পানি ব্যবহার করছেন বাপ-দাদার আমল থেকে।’

তথ্যসূত্র মতে, ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নীলফামারী সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষে ছয়টি পরিবারকে এক একর ৬৫ শতক জমির কবুলিয়ত (৯৯ বছর) দলিল করে দেন সদর উপজেলার সে সময়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদ তামান্না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৬২৩০ নম্বর দলিলে ৩০ শতক জমির মালিক হয়েছেন দক্ষিণ কিসামত গোড়গ্রামের হাবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী নূর নেহার সিকদার। কৃষক হাবিবুর রহমানের নিজস্ব কৃষি জমি আছে ২৮ শতক। তার স্ত্রী নূর নাহার শিকদার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত। গ্রামে রয়েছে চার কক্ষের টিনশেড পাকা বাড়ি।

৬২৪৪ নম্বর দলিলে ৩০ শতকের মালিক শাহ আলম ও তার স্ত্রী মজিরন বেগম যথাক্রমে হাবিবুর রহমানের ভাতিজা এবং ভাতিজা-বৌ। কৃষক বাবা বাবুল মিয়ার সঙ্গে একান্ন পরিবার তাদের। ওই পরিবারে আছে অন্তত আট বিঘা কৃষি জমি, টিনশেডের পাকা বাড়ি। শাহ আলমের ছোট ভাই ঢাকায় সরকারি চাকরিতে কর্মরত।

৬২৪৩ নম্বর দলিলে রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নূর জাহান বেগম পেয়েছেন ৩০ শতক। তারা হাবি বুর রহমানের ভাতিজি জামাতা এবং ভাতিজি। আছে কৃষি জমি এক একর। জলাশয়ের পার্শ্ববর্তী দুকুড়ি গ্রামে তাদের বাড়ি।

৬২৪৬ নম্বর দলিলে বাবুল হোসেন ও তার স্ত্রী শাহনাজ পারভীন পেয়েছেন ৩০ শতক। তারা হাবিবুর রহমানের ভাতিজি জামাই ও ভাতিজি। জলাশয়ের পার্শ্ববর্তী উত্তর কিসামত গ্রামের কৃষক বাবা আব্দুল লতিফের সঙ্গে তাদের বাস। পরিবারের কৃষি জমি রয়েছে দুই একরের উপরে। ৬২৪৫ নম্বর দলিলে সামসুল হক ও তার স্ত্রী আঙ্গুর বেগম পেয়েছেন ৩০ শতক। তারা বাবুল হোসেনের ভগ্নিপতি ও বোন। বিলের পাশের গ্রাম মুসরত গোড়গ্রামে রয়েছে টিনশেড পাকাবাড়ী। তার দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে চাকরি করেন দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে। অপর ছেলে প্রবাসে কর্মরত আছেন।

ওই পাঁচ পরিবার নিকটআত্মীয় এবং জলাশয় থেকে তাদের বাড়ি দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে।

অপরদিকে ৬২৩৯ নম্বর দলিলে কলিম উদ্দিন পেয়েছেন ১৫ শতক। বছরে কোটি টাকার চামড়ার ব্যবসা করেন তিনি। আছে টিনশেডের পাকা বাড়ি, ব্যবসায়িক গুদাম, গরুর খামার, বাড়ির সামনে একটি বাজারে পাকা মার্কেট, কৃষি জমি ১০ বিঘার উপরে। ওই জলাশয় থেকে তার বাড়ি ছয় কিলোমিটার দূরে মাঝাডাঙ্গা গ্রামে।

সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়। ভূমিহীন না হয়েও কবুলিয়তপ্রাপ্ত হাবিবুর রহমান নিজেকে ভূমিহীন দাবি করে তার স্ত্রী নূর নেহার সিকদার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মচারী এবং কবুলতপ্রাপ্ত পাঁচ পরিবার নিকটআত্মীয়ের কথা স্বীকার করেন। কবুলিয়ত দলিলে স্ত্রী নূর নেহার সিকদারের নাম থাকলেও তিনি দাবি করে বলেন, ‘ওই ৩০ শতক জমি আমার একার নামে দিয়েছে সরকার।’

অপর কবুলতপ্রাপ্ত সামসুল হক নিজেকে ভূমিহীন দাবি করে বলেন,‘এই পাকাবাড়ি আমার ছেলেদের। তারা জমি কিনে বাড়ি করেছে।’

এদিকে ব্যবসায়ী কলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার অনেক আছে, কেন ভূমিহীনের জমি চাইতে যাব? একটি জমি ক্রয়ে প্রতারিত হয়ে উপজেলা ভূমি অফিসে অভিযোগ দিয়েছিলাম। এ সময় অফিসের কর্মকর্তা আ ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরে দেখি আমার নামে ভূমিহীনের কবুলত দলিল।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে বিলটিতে ‘চিহ্নিত অরক্ষিত জলাশয় উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় প্রজাতির ছোট মৎস্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার টাকার পেনামাছ অবমুক্ত করে সদর উপজেলা মৎস্য বিভাগ। দফতরটির ওই বছরের ১১ সেপ্টম্বরের ৭৫ নম্বর পত্রে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার বরাবরে পাঠানো পত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

অপরদিকে ২০১৪ সালের জুন মাসের দিকে ‘ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টিভিটি (আইপিপি)’ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জলাশয়টি পুনঃখনন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সদর উপজেলা ক্ষুদ্র সেচ দফতর। খনন শেষে ওই সালের ৩০ জুন দফতরটির রংপুর রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) বরাবরে ৮৯৪ নম্বরে পাঠানো পত্রে এর প্রমাণ মিলে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল শুস্ক মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচ কাজে ব্যবহার এবং মৎস্য চাষে আমিষের ঘাটতি পূরণ। এ জন্য ২৫ সদস্যের একটি ব্যবস্থা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। সেটি চলমান আছে আজও।

খোকসাবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ফারুক হোসেনের কাছে খাস খতিয়ানভুক্ত ওই জমির শ্রেণি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে সেটি পুকুর হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে।’

এদিকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এলিনা আকতার বলেন, ‘ওটা আমাদের সায়রাতমহলভুক্ত না। রেকর্ডীয়ভাবে সেটি দোলা শ্রেণিতে আছে। আমার আসার আগে সেটি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। কাদেরকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে বিষয়টা এখনো তদন্ত করে দেখিনি। এখন অভিযোগ এসেছে, তদন্ত করে দেখব বিষয়টি কী? ওখানে গ্রামবাসী একদিকে হয়েছে, তাদের কিছু দাবি আছে। সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি। যদি সত্যিই সেটি বিল হয়, যদি প্রসেসে ভুল থাকে আমরা সেটি সংশোধন করব। সরকারি চাকরি করেন এমন কেউ জমি পেয়েছেন কিনা সেটি জানা নেই। তবে কোন সরকারি চাকরিজীবী খাস জমির হকদার না।’

জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমার সময় হয়নি। ফাইল বের করে দেখেছি রেজিস্ট্রির মাধ্যমে কবুলত করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনগণ আমার বরাবরে কবুলত বাতিলের আবেদন করেছেন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।’

(কে/এসপি/মে ০৯, ২০২১)

পাঠকের মতামত:

১৫ জুন ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test