E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শহরে যেভাবে গড়ে তুলবেন সবুজ ছাদবাগান

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ১৪:২৬:২০
শহরে যেভাবে গড়ে তুলবেন সবুজ ছাদবাগান

স্টাফ রিপোর্টার : শহর—একটি ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মস্ত বড় এক ক্যানভাস। এই ক্যানভাসে আছে আশা, হতাশা, ব্যস্ততা, স্বপ্ন আর নানাবিধ গল্প। তবে এসব গল্পের মধ্যে একটি বড় গল্প হলো প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

শহুরে জীবনের ব্যস্ততা যত বাড়ছে, প্রকৃতির প্রতি মানুষের টানও যেন ততই গভীর হচ্ছে। সব মানুষই কমবেশি প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতে চায়। একটু নির্মল বাতাস, একটুখানি সবুজ কিংবা পাখির ডাক—দিনভর ব্যস্ততার মাঝে এসবই এনে দিতে পারে প্রশান্তির পরশ। তাই তো সকালবেলা কোথাও একটু সবুজের দেখা পেলেই হাঁটতে বেরিয়ে যায় চেনা-অচেনা মুখগুলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও তারা যেন নাগরিক জীবনের ক্লান্তি থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়।

প্রকৃতির সেই টান থেকেই আসে ছাদবাগানের কথা। সেখানে হয়তো বিস্তৃত সবুজ মাঠের মতো হাঁটা যাবে না, নদীর পাড়ে বসে থাকা যাবে না; কিন্তু প্রাণভরে সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। ফুলের ঘ্রাণ, পাতার মৃদু দোল, ফল-সবজির বেড়ে ওঠা কিংবা সকালে পাখির আনাগোনা—সব মিলিয়ে ছোট্ট একটি ছাদও হয়ে উঠতে পারে এক টুকরো সবুজ পৃথিবী।

একটা সময় শহরও ছিল গ্রামের মতো। এখানে পাখি ডাকত, ফুল ফুটত, নদী ছিল কলকল। চারপাশে ছিল গাছপালা, খোলা জায়গা আর নির্মল বাতাস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। কথায় আছে—সময় বদলালে সবই বদলায়। সেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোট্ট শহর ঢাকাও অনেক বদলে গেছে। তাকালেই চারপাশে কংক্রিটের দেয়াল, অফিস-আদালত, বহুতল ভবন আর ব্যস্ততম যানবাহন। ব্যস্ততার
এই শহরে এখন যেন কিছুই স্থির নেই।

দেয়ালে যে পাখির ছবি দেখি, তা আর সত্যি নয়; যে গাছের ছবি দেখি, তা-ও আর সত্যি নয়। প্রকৃতির জায়গা ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে কংক্রিট। তারপরও এমন কোনো ছবি, কোনো সবুজ দৃশ্য কিংবা হঠাৎ দেখা একটি গাছ হয়তো এখনো কারও কারও মনে ইচ্ছে জাগায়—এমন একটি পরিবেশকে বাস্তব রূপ দেওয়ার।

আর সেই ইচ্ছা থেকেই নিজের ছোট্ট ছাদটিকে সবুজ করে তোলার উদ্যোগের প্রশ্ন আসে। কীভাবে একটি ছোট্ট ছাদে একটি বাগান গড়ে তুলবেন—কোন গাছ লাগাবেন, কীভাবে জায়গা নির্বাচন করবেন এবং কীভাবে পরিচর্যা করবেন—মনে মনে হয়তো ভাবছেন এসবই। এই প্রতিবেদনে সেই কথাই তুলে ধরা হলো।

শৌখিন নয়, বাস্তবিক হতে হবে
ছাদবাগানের ইতিহাস আজকের নয়। প্রাচীন সভ্যতাতেও ছাদে বাগান করার প্রচলন ছিল। খ্রিস্টের জন্মেরও আগে মেসোপটেমিয়া ও পারস্যের জিগুরাত নামের পিরামিড আকৃতির উঁচু পাথরের স্থাপনায় বাগান ও ছোট গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করার নিদর্শন পাওয়া যায়।

তাই একটি ইতিহাসবহুল কাজের জন্য দরকার বাস্তবিক মানসিকতা। কেননা শৌখিন কোনো কিছুই চিরস্থায়ী হয় না।

মানসিকতা স্থির করে প্রথমেই ছাদের আয়তন মাথায় গেঁথে নিতে হবে। কতটুকু জায়গা, কী গাছ লাগাবেন, কোনটি লাগালে বেশি ভালো হবে, কোন পাশে কোন গাছটি লাগানো যায় কিংবা কোন আয়তনের গাছ লাগাবেন—এসব আগে থেকেই বুঝে নিতে হবে। এরপর দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে সেই অনুযায়ী এগোতে হবে।

গাছের চারা কেনার সময় চারা নির্বাচন, সতেজতা, আকার ও গুণগত মানের মতো বিষয়গুলোর দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

যেভাবে শুরু করবেন
প্রথম ধাপ শেষ হলে এবার আসবে দ্বিতীয় ধাপ। অর্থাৎ, গাছ কেনা শেষ হলে সেগুলো বাসায় নিয়ে এসে রোপণ করতে হবে। এজন্যও লাগবে পরিকল্পনা। কত দূরত্বে চারাগুলো লাগাবেন, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে।

শুরুতে ছাদের আয়তন অনুসারে কাগজে-কলমে একটি খসড়া ম্যাপ করে বিভিন্ন স্থাপনা ও ভবনের কলামগুলো চিহ্নিত করে নিতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাহিদা ও রুচি অনুসারে বাগান সাজানো না হলে পরে এর পুনর্বিন্যাস করা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য একটি কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

বড় বা ভারী গাছগুলো ছাদের বিম বা কলামের নিকটবর্তী স্থান বরাবর স্থাপন করতে হবে। ছাদ যেন ড্যাম্প বা স্যাঁতসেঁতে না হয়, সে জন্য রিং বা ইটের ওপর ড্রাম কিংবা টব স্থাপন করলে নিচ দিয়ে আলো-বাতাস চলাচল করবে এবং ছাদও ড্যাম্প হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। নেট ফিনিশিংয়ের মাধ্যমেও ছাদকে ড্যাম্প প্রতিরোধী করা যায়।

চাহিদা অনুসারে হাফ ড্রাম, সিমেন্ট বা মাটির টব, স্টিল কিংবা প্লাস্টিকের ট্রে সংগ্রহ করতে হবে। অনেক সময় বাড়ির ভাঙা চৌবাচ্চা, পুরোনো বালতি, অব্যবহৃত তেলের বোতলও ছোটখাটো গাছ রোপণের জন্য ব্যবহার করা হয়। ঠিকমতো উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে এসব অব্যবহৃত জিনিস বাগানে ব্যবহার করা গেলে এটিও হতে পারে এক নতুন নান্দনিকতা।

ছাদের সুবিধামতো স্থানে স্থায়ী বেড (ছাদ ও বেডের মাঝে ফাঁকা রাখতে হবে) স্থাপন করা যেতে পারে। এসব বেডে মূলত সবজি ও শাক চাষ করা যায়। চাইলে লাগানো যায় ফুলগাছও। স্থায়ী বেড বানাতে না চাইলে পুরোনো চৌবাচ্চা বা জাহাজের লাইফবোটের বয়ার খোলও অনেক জায়গায় বেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

যেহেতু ছাদবাগান স্বল্প পরিসরে গড়ে তোলা হয়, কাজেই এর যত্ন-আত্তির দিকে সব সময় নজর রাখা আবশ্যক। সে জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রথমেই সংগ্রহ করে নিতে হবে। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে সিকেচার, কোদাল, কাঁচি, ঝরনা, বালতি, করাত, খুরপি, স্প্রে মেশিন ইত্যাদি।

চারা রোপণের আগে চারার উচ্চতা, শিকড়ের প্রকৃতি, সহিষ্ণুতা—এসব বিষয়েও নজর রাখতে হবে। যেসব চারা ও গাছ ছাদবাগানের জন্য উপযুক্ত নয়, সেগুলো বর্জন করতে হবে।

বলা হয়, শহরে ছাদবাগান স্থাপন করা হলে শহরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে আসতে পারে। কেননা শহরগুলোতে মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমে আসছে। ইট-কাঠের ভবনের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাঁচে মোড়ানো বহুতল ভবন। বিশেষ করে জানালায় কাঁচ এবং বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস।

গাছ রোপণের নিয়ম
সাধারণত ফলগাছের জন্য হাফ ড্রাম ব্যবহার করা উচিত। এর তলদেশে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ১ ইঞ্চি ব্যাসের ৫–৬টি ছিদ্র রাখতে হবে। ছিদ্রগুলোর ওপর মাটির টবের ভাঙা টুকরো বসিয়ে দিতে হবে।

ড্রামের তলদেশে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ইটের খোয়া বিছিয়ে তার ওপর বালি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সমপরিমাণ দো-আঁশ মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ড্রামটির দুই-তৃতীয়াংশ ভরার পর হাফ ড্রাম অনুযায়ী ড্রামপ্রতি মিশ্র সার আনুমানিক ৫০–১০০ গ্রাম প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর সম্পূর্ণ ড্রামটি মাটি দিয়ে ভর্তি করে নিতে হবে।

১৫ দিন পর ড্রামের ঠিক মাঝখানে মাটির বলের পরিমাণ অনুযায়ী গর্ত করে কাঙ্ক্ষিত গাছটি রোপণ করতে হবে। এ সময় চারাগাছটির অতিরিক্ত ও মরা শিকড়গুলো কেটে ফেলতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে, মাটির বলটি যেন ভেঙে না যায়।

রোপিত গাছটিকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। রোপণের পর গাছের গোড়া ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে।

পরিচর্যা করতে হবে নিয়মিত
ছক আঁকা, পছন্দের গাছ লাগানো—সব কাজ শেষ হলেই কিন্তু ছাদবাগানের কাজ শেষ নয়; বরং এখান থেকেই মূল কাজ শুরু। আর সেটা হলো লাগানো গাছের পরিচর্যা করা। যেন গাছগুলো না মরে—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভাবতে হবে, গাছ আপনার প্রাণের একটি অংশ। তার চাহিদা কী, সে কীভাবে প্রসারিত হবে—এসব দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।

নিয়ম মেনে প্রতিনিয়ত পানি ও অন্যান্য সেবা প্রদান করতে হবে। যেহেতু গাছের কাছ থেকেই সবুজ উপহার নিতে চান, তাই তার সেবা করাও অত্যন্ত জরুরি। প্রবাদে আছে, ‘উপকার করলে প্রতিদান পাওয়া যায়।’ ফলে সেই প্রতিদান পেতে হলে গাছের প্রয়োজনের দিকগুলোতেও খেয়াল রাখতে হবে।

এরপর অতিরিক্ত গজিয়ে ওঠা ডালপালা ছাঁটতে হবে। কিছু কিছু জায়গায় ছাদবাগানের বড় সমস্যা হলো পাখির উপদ্রব, বিশেষ করে ফলগাছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য উঁচু করে তারের জালি কিংবা জাল দিয়ে পুরো ছাদের ওপর ও পাশ ঢেকে দেওয়া যেতে পারে।

প্রতি বছর না হলেও এক বছর পরপর টবের পুরোনো মাটি পরিবর্তন করে নতুন গোবর-মিশ্রিত মাটি দিয়ে পুনরায় টব বা ড্রাম ভরে দিতে হবে। এ সময় খেয়াল রাখতে হবে, গাছ যেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অপটু হাতে মাটি পরিবর্তন না করিয়ে এ ব্যাপারে দক্ষ মালি বা নার্সারির সহায়তা গ্রহণ করাই ভালো।

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬)





পাঠকের মতামত:

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test